চাকরির বাজারে শুধু যোগ্যতা থাকলেই সব সময় এগিয়ে থাকা যায় না। একই পদে শত শত প্রার্থী আবেদন করলে নিয়োগকর্তার নজর কাড়তে প্রয়োজন হয় আলাদা পরিচিতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা। আর সেই পরিচিতি তৈরি করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং। বিস্তারিত লিখেছেন আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের যোগাযোগ ও উন্নয়ন প্রধান ফরিদ উদ্দিন খান
আপনি একটা চাকরির জন্য আবেদন করলেন। আপনার সিভি পাঠালেন। কিন্তু একই পদের জন্য আবেদন করেছেন আরো ২০০ জন। নিয়োগকর্তা কার সিভি আগে পড়বেন? কার নাম তার মাথায় আগে আসবে? উত্তরটা প্রায়ই এই নয় যে, কার সিভি সবচেয়ে ভালো, বরং কার নাম তিনি আগেই চেনেন। এটাই পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের শক্তি।
LinkedIn-এর তথ্য অনুযায়ী, ৮৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা একজন প্রার্থীর শক্তিশালী পার্সোনাল ব্র্যান্ড দেখে তাকে প্রাধান্য দেন। CareerBuilder বলছে, ৭০ শতাংশ নিয়োগকর্তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রার্থীর সামাজিক মাধ্যম দেখেন। আর সবচেয়ে কঠিন তথ্য হলো, ৫৪ শতাংশ নিয়োগকর্তা দুর্বল অনলাইন উপস্থিতির কারণে প্রার্থী বাতিল করেছেন।
অর্থাৎ, আপনার অনলাইন পরিচয় এখন আপনার সিভির মতোই গুরুত্বপূর্ণ; অনেক সময় আরো বেশি।
পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং মানে কি শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করা? মোটেই না। পার্সোনাল ব্র্যান্ড হলো আপনি কী জানেন, কী বিশ্বাস করেন, কীভাবে কাজ করেন এবং অন্যরা আপনাকে কীভাবে মনে রাখে—এই সবকিছুর একটা সুসংগত প্রকাশ। এটা হতে পারে আপনার LinkedIn-এ নিয়মিত পেশাদার বিষয়ে লেখার অভ্যাস। হতে পারে একটা YouTube চ্যানেল, যেখানে আপনি নিজের দক্ষতা শেখান। হতে পারে কোনো ইন্ডাস্ট্রি ইভেন্টে বক্তা হিসেবে অংশ নেওয়া।
Forbes-এর তথ্য বলছে, শক্তিশালী পার্সোনাল ব্র্যান্ডের পেশাদাররা গড়ে ২৫ শতাংশ বেশি আয় করেন। শুধু চাকরিতে নয়, উদ্যোক্তা হিসেবেও পার্সোনাল ব্র্যান্ড সরাসরি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। HubSpot জানাচ্ছে, ৪০ শতাংশ পেশাদার মানুষ বলছেন, তাদের পার্সোনাল ব্র্যান্ডই নতুন ক্লায়েন্ট এনে দেয়।
তাহলে নিজের ব্র্যান্ড তৈরিতে কোথা থেকে শুরু করবেন? প্রথম কাজ হলো নিজেকে একটা প্রশ্ন করুন—‘আমি কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলতে পারি, শিখতে পারি এবং অন্যকে শেখাতে পারি?’ সেটাই আপনার ব্র্যান্ডের ভিত্তি।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো ধারাবাহিকতা। একটা LinkedIn পোস্ট দিয়ে ব্র্যান্ড হয় না। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে একটা করে প্রাসঙ্গিক, সৎ ও মূল্যবান লেখা বা ভিডিও, সেটাই ধীরে ধীরে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। ২০২৫ সালে LinkedIn-এর তথ্য দেখাচ্ছে, যারা প্রতি তিন দিনে অন্তত একবার কনটেন্ট শেয়ার করেন, তাদের প্রোফাইলের দৃশ্যমানতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
তৃতীয় বিষয়টি হলো সত্যতা। পার্সোনাল ব্র্যান্ড সেটাই টেকসই হয়, যেটা আসলেই সাজানো নয়। মানুষ মিথ্যা গল্প সহজেই ধরে ফেলে; কিন্তু নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা থেকে শেখার গল্প, নিজের দৃষ্টিভঙ্গি—এগুলো মানুষকে টানে।
মনে রাখুন, ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপে—প্রথম চাকরি পাওয়া, পদোন্নতি অর্জন, উদ্যোক্তা হওয়া, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং যা-ই হোক না কেন মূল কাজ কিন্তু একটাই। সেটি হলো নিজের এমন একটি অবস্থান তৈরি করা, যা সবার কাছে এই বার্তা দেয়—‘এই মানুষটাকে চেনো? এই মানুষটা বিশ্বাসযোগ্য।’ এই বিশ্বাসযোগ্যতাই সব দরজার চাবিকাঠি।
আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় আপনার অনলাইন পরিচয় আপনার সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার সম্পদ। এটা তৈরিতে দেরি করলে পিছিয়ে পড়বেন। এখনই শুরু করুন।