শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ও তুলনামূলক কম মূল্যের রড ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়া নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেশ উন্নয়ন করপোরেশন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর আওতায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলমান। এর মধ্যে দেশ উন্নয়ন করপোরেশনের সঙ্গে ৫৩ কোটি টাকার চুক্তিতে ১০ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। একই প্রতিষ্ঠান ৮৭ কোটি টাকার চুক্তিতে আরেকটি ১০ তলা আবাসিক হলও নির্মাণ করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণসামগ্রী রাখার স্থানে বেশ কয়েকটি মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্টের বস্তা রয়েছে। এসব সিমেন্টের কোনো কোনোটির মেয়াদ গত বছরের এপ্রিল, সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে গেছে। আবার কিছু সিমেন্টের মেয়াদ চলতি বছরের জানুয়ারিতে শেষ হলেও সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা যায়। পাশাপাশি জুলাইয়ে উৎপাদিত সিমেন্টও ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ সময় আরো দেখা যায়, ভবন নির্মাণে এসএএস (শফিউল আলম স্টিল) কোম্পানির রড ব্যবহার করা হচ্ছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০টি রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ১০টির মধ্যে এসএএসের নাম নেই। শাবিপ্রবির সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিশেষজ্ঞদের দাবি, বুয়েট বা শাবিপ্রবিসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সাধারণত এ রড ব্যবহারের পরামর্শ দেন না।
নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, ছাদের কয়েকটি স্থানে পর্যাপ্ত কংক্রিট না দেওয়ায় রড উন্মুক্ত হয়ে রয়েছে। একইসঙ্গে কাজে নিম্নমানের পাথর ও বালু ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন শিক্ষার্থীরা।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, আর্থিক সংকটের কারণে এতদিন কাজ ধীরগতিতে হয়েছে। ইউজিসির নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট ইঞ্জিনিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের আনুমানিক ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচএমএ মাহজুজ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহার করলে পর্যাপ্ত শক্তি পাওয়া যায় না। অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। ফলে এটি ভালোভাবে মিশ্রিত হয় না এবং কংক্রিটের কাঙ্ক্ষিত গুণগত মান ও শক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। সিমেন্ট দুই মাসের বেশি সময় সংরক্ষিত থাকলে তা ব্যবহার না করাই ভালো।
রডের বিষয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষায় যদি পিডব্লিউডির নির্ধারিত ৬০ কেএসআই (কিলোপাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি) মান নিশ্চিত হয়, তাহলে ব্যবহারে আপত্তির যৌক্তিক কারণ নেই। তবে আমরা সব সময় ভালো ব্র্যান্ড ও মানসম্মত রড ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকি।
পাথর ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাথরের গ্রেডেশন অনুযায়ী ছোট থেকে বড় বিভিন্ন আকারের পাথর নির্দিষ্ট অনুপাতে থাকতে হয়। একই আকারের পাথর ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৯ মিলিমিটার এবং সর্বনিম্ন ১০ মিলিমিটার আকারের পাথর থাকা প্রয়োজন।
ঢালাইয়ের পর ছাদে রড উন্মুক্ত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, রড বের হয়ে থাকলে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে রডে মরিচা ধরতে পারে এবং আশপাশের কংক্রিটে চাপ সৃষ্টি হয়ে ফাটল দেখা দিতে পারে। ছাদের ঢালাইয়ে রডের ওপর অন্তত ০.৬ থেকে ০.৮ ইঞ্চি কংক্রিট কভার থাকা উচিত। আর কলাম ও বিমের ক্ষেত্রে সাধারণত ১.৫ থেকে ২ ইঞ্চি কংক্রিট কভার প্রয়োজন, যাতে রড সরাসরি বাতাস ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে না আসে।
অভিযোগের বিষয়ে দেশ উন্নয়ন করপোরেশনের প্রজেক্ট ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহারের প্রশ্নই আসে না। আমরা রানিং লাফার্জ সিমেন্ট ব্যবহার করছি। পুরোনো সিমেন্ট নিচে রাখি, তার ওপর নতুন সিমেন্ট রাখি। তবে নির্মাণশ্রমিকদের দাবি, এসব মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্টই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
রড ব্যবহারের বিষয়ে আরিফুল ইসলাম বলেন, এটি পিডব্লিউডির তালিকাভুক্ত রড, তাই আমরা ব্যবহার করতে পারি। বাংলাদেশের কোনো ঠিকাদারই বিএসআরএম বা কেএসআরএম রড ব্যবহার করে না। আমার পক্ষে সেটি ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
ছাদে রড উন্মুক্ত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ছাদের মধ্যে রড বের হয়ে থাকার কথা নয়। হয়তো মিস্ত্রির অসাবধানতায় এমন হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করায় তিনি বলেন, এসব জানতে চেয়ে আমাকে হয়রানি করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। তবে প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, বস্তায় সিমেন্টের মেয়াদ লেখা থাকে না। এখানে মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্টও ব্যবহার করা হয় না। আমরা ভালো মানের রড ব্যবহারের চেষ্টা করি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাভের জন্য সব সময় ভালো ব্র্যান্ডের রড ব্যবহার করে না। এখানে আমার কোনো কমিশন নেই।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাজেদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ডিপিপির অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী এ প্রকল্পের বিষয়ে মন্তব্য করার দায়িত্ব উপাচার্যের।