হোম > শিক্ষা > ক্যাম্পাস

ছবিতে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন সাদিক খান

শাহ বিলিয়া জুলফিকার

একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী—এই বহুলপ্রচলিত প্রবাদকে নিজের কাজের মাধ্যমে সত্যে রূপ দিয়েছেন তরুণ আলোকচিত্রী সাদিকুর রহমান খান। জামালপুরের এক নিভৃত গ্রাম থেকে উঠে এসে সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সম্ভাবনার আলো খুঁজে নেওয়া এই তরুণ আজ নিজের স্বপ্নের পথে দৃঢ় পদচারণে এগিয়ে চলেছেন। তার সেই স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সৃজনযাত্রা নিয়ে লিখেছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার

শৈশব ও আলোকচিত্রের হাতেখড়ি

জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার রায়ের বাকাই গ্রামের নিভৃত পরিবেশেই বেড়ে ওঠা সাদিক খানের ছোট্ট জগৎ ছিল বাবা, মা আর ছোট বোনকে ঘিরে। শৈশব থেকেই ছবির প্রতি তার গভীর আকর্ষণ ছিল; বাড়িতে চাচার একটি ক্যামেরাই প্রথম তাকে এই জগৎ সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলে। সেখান থেকেই শুরু—কখনো ফিল্মের ক্যামেরা ভাড়া করে, কখনো আবার একটি সাধারণ বাটন ফোন দিয়েই ছবি তোলার নিরন্তর চেষ্টা। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও থেমে থাকেননি তিনি। পড়াশোনায়ও ছিলেন সমান মনোযোগী ও মেধাবী। জামালপুরের ফুলকোচা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ ৫ অর্জনের পর তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। সেখানে একাডেমিক জীবন ও আলোকচিত্রের প্রতি তার অনুরাগ পাশাপাশি এগিয়ে চলে।

প্রকৃতির টানে বাকৃবি ও সংগঠনের জন্ম

মেধাবী শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ ছেড়ে সাদিক খান বেছে নেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে। ব্রহ্মপুত্র নদের তীর আর সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসই হয়ে ওঠে তার সৃজনশীলতার প্রধান অনুপ্রেরণা। ২০১৫ সালে একদল আগ্রহী বন্ধুকে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি’, যেখান থেকেই শখের ফটোগ্রাফি ধীরে ধীরে পেশায় রূপ নিতে শুরু করে। লতিফ হোসাইন ও মাজেদ চৌধুরীর মতো অভিজ্ঞ আলোকচিত্রীদের সান্নিধ্যে তিনি আয়ত্ত করেন ছবির সূক্ষ্ম দিকগুলো। তার তোলা অসংখ্য ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে ‘নাড়ির টানে, বাড়ির পানে’ শিরোনামের ছবিটি, যেখানে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের ট্রেনের ছাদভর্তি ভিড়ের দৃশ্য ধরা পড়ে, ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রথম পাতায় লিড ফটো হিসেবে প্রকাশিত হয়।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, ফেটে যাওয়া শুকনো পুকুরের মাঝে একটি শিশু খরগোশ নিয়ে খেলছে। রুক্ষতার ভেতরেও জীবনের কোমলতা তুলে ধরতে তিনি গাছের মগডালে উঠে সেই ফ্রেম ধারণ করেন। ঝুঁকি নিতে তিনি কখনো পিছপা নন। বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ডের সময় এক হাতে পানির পাইপ ধরে অন্য হাতে ছবি তুলতে গিয়ে পায়ে পেরেক ঢুকে গেলেও ছবি তোলার নেশায় তা টেরই পাননি।

বুক ফটোগ্রাফির পথিকৃৎ

ফটোগ্রাফির জগতে সাদিক খান সূচনা করেছেন এক ভিন্নধর্মী ধারা—‘থিমেটিক বুক ফটোগ্রাফি’। যেখানে একসময় বইয়ের ছবি মানেই ছিল টেবিল বা তাকের ওপর সাদামাটা উপস্থাপন, সেখানে তিনি বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করতে শুরু করেন আলাদা ব্যাকগ্রাউন্ড ও ভাবনানির্ভর দৃশ্যপট। ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সৃজনশীল প্রয়াস ধীরে ধীরে তাকে এনে দেয় স্বতন্ত্র পরিচিতি, আর একই সঙ্গে বাংলাদেশে বুক ফটোগ্রাফিকে একটি নতুন শিল্পরূপে জনপ্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে, অমর একুশে বইমেলাকে ঘিরে লেখক-পাঠকদের ফেসবুক টাইমলাইন তার তোলা নান্দনিক ছবিতে ভরে ওঠে, যেখানে প্রতিটি বই যেন নিজস্ব গল্প নিয়ে নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মানবিক আলোকচিত্রী ও পশুপ্রেম

সাদিক খান শুধু আলোকচিত্রী নন, মানবিকতা ও সহমর্মিতায়ও তিনি আলাদা করে পরিচিত। বন্যার মতো দুর্যোগে নিজের তোলা ছবি বিক্রি করে সেই অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তার এই দায়বদ্ধতা মানুষের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণিজগতেও। অসুস্থ টিয়া, শালিক, পেঁচা কিংবা চিল—যেকোনো আহত পাখিই আশ্রয় পায় তার ঘরে। স্নেহ ও যত্নে তাদের সুস্থ করে আবার ফিরিয়ে দেন প্রকৃতির কোলে। এমনই এক স্মরণীয় ঘটনায়, তার সেবা পেয়ে সুস্থ হওয়া একটি টিয়া পাখি ৪৭ দিন পর আবার ফিরে এসেছিল তার কাছেই—মানুষ ও প্রাণীর নিঃশব্দ এক বন্ধনের অনন্য সাক্ষ্য হয়ে।

বহুমুখী প্রতিভা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন

শুধু ক্যামেরার ফ্রেমেই সীমাবদ্ধ নন সাদিক খান; তার সুরেলা কণ্ঠও সমানভাবে মুগ্ধ করে শ্রোতাদের। কবিতা লেখা, গান গাওয়া এবং মাউথ অর্গান বাজানো—সৃজনশীলতার এই বহুমাত্রিকতায় তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন এক পূর্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে। এমনকি তার কণ্ঠের প্রশংসা করেছেন কিংবদন্তি সুরকাররাও।

বর্তমানে আলোকচিত্রের পাশাপাশি গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবেও কাজ করছেন তিনি, যেখানে ‘পিক্সমামা ডট কম’-এর মতো প্রতিষ্ঠান তার প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যৎ স্বপ্ন আরো বিস্তৃত—বাংলাদেশের ৬৪ জেলার প্রতিটি উপজেলায় ঘুরে দেশের প্রকৃত সৌন্দর্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে চান তিনি।

তার বিশ্বাস, ভালো ফটোগ্রাফার হতে দামি ডিভাইস নয়, প্রয়োজন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। নিজেকে তিনি দেখতে চান ‘ছবির গল্পকার’ হিসেবে—যার প্রতিটি ফ্রেমে লুকিয়ে থাকবে জীবনের অনুচ্চারিত গল্প।

সাদিক খানের এই পথচলা যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও একাগ্রতা থাকলে সাধারণ একটি বাটন ফোন হাতে শুরু করা যাত্রাও একদিন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারে। আর এই গল্পই হয়ে উঠতে পারে তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বন্ধে পাকিস্তানের নতুন উদ্যোগ

বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আতঙ্কের জনপদ ঈশ্বরদী

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবিতে সমাবেশ

লোডশেডিংয়ে ২০-২৫ কোটি টাকার মাছ মারা গেছে

উপসম্পাদকীয়: তারেক রহমানকে কেন দিল্লি নিতে বেপরোয়া ভারত?

একরামুল হত্যা মামলা: ট্রাইব্যুনালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ

সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রে, রাজনৈতিক অর্থের দাপট কেন

নাগেশ্বরীতে সুস্থ ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধী সাজিয়ে সরকারি ভাতা প্রদান, তদন্তের দাবি

৭ বছর পর ভারত সফরে শি জিনপিং

সিরিয়াকে সন্ত্রাসের মদতদাতা রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দিল যুক্তরাষ্ট্র