ক্যাম্পাসজুড়ে তখন চাকরির খোঁজে তরুণদের ভিড়। কারো হাতে জীবনবৃত্তান্ত, কেউ দাঁড়িয়ে আছেন পছন্দের প্রতিষ্ঠানের বুথের সামনে, আবার কেউ শেষ মুহূর্তে নিজের সিভির তথ্য মিলিয়ে নিচ্ছেন। একদিকে চীনের ঐতিহ্যবাহী লায়ন ড্যান্স, তাই চি ও সংগীতের সাংস্কৃতিক আয়োজন; অন্যদিকে বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রত্যাশা। এমনই এক ব্যতিক্রমী আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য চীনের ৩১টি প্রতিষ্ঠানে ৪৩০টির বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।
গত ১৭ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় ‘সিনো-বাংলা ডে ২০২৬ : চাইনিজ এন্টারপ্রাইজ জব ফেয়ার’। বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এবং ডাকসু ও কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের আয়োজনে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী এ চাকরি মেলায় হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী অংশ নেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বুথে সিভি জমা দিয়ে নিজেদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা খোঁজেন শিক্ষার্থীরা। আয়োজকদের ভাষ্য, শুধু একটি চাকরি মেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দুই দেশের শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ তৈরির লক্ষ্য থেকেই এ আয়োজন করা হয়েছে। ডাকসুর সাম্প্রতিক চীন সফরের ধারাবাহিকতায় চীনা দূতাবাস ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের পর এ চাকরি মেলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়।
সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলা এ মেলায় প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতের ৩১টি চীনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানগুলোয় ৪৩০টির বেশি পদে চাকরির সুযোগ রাখা হয়। চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে চার শতাধিক সিভি গ্রহণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিক বাছাইয়ের পর যোগ্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে নিয়োগ দেবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
দেশে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সরাসরি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে এমন চাকরি মেলাকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন অংশগ্রহণকারীরা। সাধারণত চাকরির জন্য দীর্ঘ আবেদন প্রক্রিয়া ও একাধিক ধাপ পার হতে হলেও এই আয়োজনে শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কাছে নিজেদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
মেলায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী সুমাইয়া জাফরিন বলেন, চাকরির এই দুর্মূল্যের বাজারে উচ্চ বেতনের ৪৩০টির বেশি পদে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বিষয়। বেকার তরুণদের জন্য এত বড় একটি আয়োজন করতে ডাকসুর নেতারা দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আয়োজকদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর চাকরির বাজারে প্রবেশের আগে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়াই ছিল এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। সেই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক কর্মবাজারের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
চীন সফর থেকে চাকরি মেলার পরিকল্পনা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রাতিষ্ঠানিক এই ব্যর্থতার জায়গা থেকেই ডাকসু শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরির দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘সব ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমরা এ ধরনের কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যাব, যার মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীরা দুনিয়াজুড়ে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে।’
সাদিক কায়েম জানান, সম্প্রতি ডাকসুর একটি প্রতিনিধিদল চীন সফর করে। সে সময় তারা শুধু আনুষ্ঠানিক সফরে সীমাবদ্ধ না থেকে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র সংসদ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ ও চীনের মানুষের মধ্যে ‘পিপল-টু-পিপল কানেকশন’ বা পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে আরো শক্তিশালী করা যায়, সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
চীন সফর থেকে ফিরে চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডাকসুর পক্ষ থেকে একটি চাকরি মেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে দূতাবাস, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় আয়োজনটি বাস্তবায়িত হয়।
ডাকসু ভিপির দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এত বড় পরিসরে চীনা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে এ ধরনের চাকরি মেলা আগে অনুষ্ঠিত হয়নি। এবারের আয়োজনে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতের ৩১টি চীনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে এবং চার শতাধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আয়োজনটি শুধু চাকরির সুযোগেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিও এতে যুক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ও হুয়াওয়ে টেকনোলজিস লিমিটেডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। একই সঙ্গে ‘হুয়াওয়ে এআই ট্রেনিং প্রোগ্রাম’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ৩১টির বেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে প্রায় ৪৩০টি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য হুয়াওয়ের বছরব্যাপী বিনা মূল্যের এআই প্রশিক্ষণের সুযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ও সিএমসির যৌথ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘সিনো-বাংলা ফ্রেন্ডশিপ’ স্কলারশিপ ও বার্সারি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। ২০২৬ সালের চাইনিজ গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ অর্জনকারীদের জন্য প্রাক-যাত্রা দিকনির্দেশনামূলক ওরিয়েন্টেশনও অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজকদের ভাষ্য, ‘সিনো-বাংলা ডে’ নামের মধ্যেই মূলত দুই দেশের সম্পর্কের একটি বৃহত্তর বার্তা রয়েছে। চাকরি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ আয়োজন। আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকা ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদক জসিম উদ্দীন খান আমার দেশকে বলেন, নতুন বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।