ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া মেখে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য শিক্ষালয়—ঢাকা কলেজ। ১৮৪১ সালের ২০ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি কলেজ নয়; উপমহাদেশের শিক্ষা-ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। যুগে যুগে জ্ঞানচর্চা, প্রগতিশীল চিন্তা ও নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা কলেজ গড়ে তুলেছে নিজস্ব এক গৌরবময় ঐতিহ্য। সময়ের পরিক্রমায় বহু পরিবর্তন এলেও ইতিহাস ও মূল্যবোধকে বুকে ধারণ করে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠ—যার প্রতিটি ইট-পাথরে লুকিয়ে আছে শিক্ষা, সংগ্রাম ও আলোকিত ভবিষ্যতের গল্প।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ‘ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শাসকে পরিণত হলেও ব্রিটিশরা এ অঞ্চলের জন্য কোনো শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেনি। অবশেষে ১৮ শতকের ৩০-এর দশকে সরকার এক শিক্ষানীতি গ্রহণ করে, যা পাশ্চাত্য বা ইংরেজি শিক্ষা নামে পরিচিতি পায়। ইংরেজি সাহিত্য ও বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য পূর্ব বাংলায় যতগুলো সম্ভব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে ১৮৩৫ সালের ‘General Committe of Public Instruction’ লর্ড বেন্টিংকের কাছে প্রতিবেদন পেশ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন সিভিল সার্জন ড. জেমস টেইলর ও ঢাকা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট মি. গ্রান্টের প্রচেষ্টায় ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। ১৮৪১ সালের ২০ নভেম্বর সদরঘাটে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা হয়ে ওঠে সমগ্র পূর্ব বাংলার ইংরেজি শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।
প্রথম অধ্যক্ষ
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও হিন্দু কলেজের নামকরা শিক্ষক জে আয়ারল্যান্ডকে (J Ireland) ১৮৪১ সালে ঢাকা কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত করা হয়। ১৮৪১ থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা কলেজ নামের বিবর্তন : ঢাকা ইংলিশ সেমিনারি স্কুল® ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজ® ঢাকা সরকারি কলেজ® ঢাকা কলেজ
অধিভুক্তির কালানুক্রম : ১৮৫৭-১৯২১ – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯২১-১৯৯২ – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯২-২০১৭ – জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৭-২০২৫ – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা কলেজের প্রথম গ্রন্থাগার কার্জন হল
বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ১৯০৪ সালে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের নামানুসারে কার্জন হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর ঢাকা কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে কার্জন হলের পূর্ব পাশের কলেজ রোড মূলত ঢাকা কলেজের স্মৃতিচিহ্ন।
পূর্ব বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষার সূচনা
১৮৭৫ সালে ঢাকা কলেজে বিজ্ঞানবিষয়ক নতুন নতুন বিষয় পড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর ফলে পূর্ব বাংলার তরুণদের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার যুগে প্রবেশ করার হিড়িক পড়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে ঢাকা কলেজের অবদান
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ভবন, ছাত্র, শিক্ষক, বইপত্র, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, কর্মচারী, ভিটেমাটি—সর্বস্ব দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সহযোগিতা করে ঢাকা কলেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও খুব বেশি ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাইত না, কারণ ঢাকা কলেজের গ্র্যাজুয়েটরা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পেতেন। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সুযোগ করে দিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা বন্ধ করে দেয় ঢাকা কলেজ।
ঢাকা কলেজ থেকে কার্জন হল, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হল স্থানান্তরিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
আজকের কার্জন হল একসময় ঢাকা কলেজের লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ঢাকা হল (বর্তমান ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল) ঢাকা কলেজের আবাসিক হোস্টেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ে ঢাকা কলেজের দুটি ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠিত হয়। হোস্টেলের নাম দেওয়া হয় ‘সেক্রেটারিয়েট মুসলিম হোস্টেল’। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল প্রতিষ্ঠিত হলে ‘সেক্রেটারিয়েট মুসলিম হোস্টেল’ হয়ে যায় মুসলিম হল (বর্তমান সলিমুল্লাহ মুসলিম হল)। কার্জন হল, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলসহ ঢাকা কলেজের চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চ নিয়ে আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কার্জন হল বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদ হিসেবে এবং শহীদুল্লাহ হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রদের আবাসিক হল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
নিজ নামে উদ্ভাসিত ঢাকা কলেজের ছাত্র-শিক্ষক
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন, দীনেশচন্দ্র সেন, বুদ্ধদেব বসু ও মহাদেব সাহার মতো গুণী সাহিত্যিক ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতার রূপকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রথমে ঢাকা কলেজের ছাত্র এবং পরে একই কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবী কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান ১৯৫৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করেন। ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’-এর প্রতিষ্ঠাতা আলোকিত মানুষ তৈরির কারিগর, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যখন ঢাকা কলেজে শিক্ষকতায় যোগদান করেন, তখন ঢাকা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন শওকত ওসমান।
নানা স্থানে ক্যাম্পাস স্থানান্তর
১৮৪১ সালে সদরঘাটের বুড়িগঙ্গার তীরে প্রথম ক্যাম্পাস স্থাপন করা হয়। ১৯০৮ সালে কলেজটি কার্জন হলে অভিবাসিত হয়। ১৯২১ সালের পর ‘ঢাকা কলেজ’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভিটেমাটি সর্বস্ব দিয়ে পুরোনো হাইকোর্টের লাট ভবনে (বর্তমান সুপ্রিম কোর্ট) নীড় বাঁধে। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সেনা তাঁবু হাইকোর্ট ভবন দখল করে নেয়। ১৯৪৩ সালে ইসলামিয়া ইন্টারমিডিয়েট কলেজের (বর্তমান কবি নজরুল কলেজের মূল ভবন) দালানে কিছুদিন এবং গুলিস্তান ফুলবাড়িয়া স্টেশনসংলগ্ন সিদ্দিক বাজারে কিছুদিন ঢাকা কলেজের কার্যক্রম চলে। অবশেষে ১৯৫৫ সালে ১৮ একর জমিতে (মিরপুর রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা ১২০৫) স্থায়ীভাবে নীড় বাঁধে।
‘ইন্টারন্যাশনাল হল’ একসময়কার বিদেশি ছাত্রদের আবাস
একসময় ঢাকা কলেজে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি ছাত্র ভর্তি হতো। ফলে বিদেশি ছাত্রদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ইন্টারন্যাশনাল হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। দীর্ঘ ৩০ বছরব্যাপী মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. মামুন আবদুল গাইয়ুম ঢাকা কলেজের ইন্টারন্যাশনাল হলের ২০৯ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।
‘পশ্চিম ছাত্রাবাস’ সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাত্রদের জন্য স্বতন্ত্র ছাত্রাবাস
১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ হলপাড়ার মাঠের পশ্চিম পাশে সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাত্রদের জন্য আলাদা ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়। পূজা-অর্চনার জন্য সেখানে আলাদা প্রার্থনা কক্ষ রয়েছে।
আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা কলেজের অবদান
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব থেকে শুরু করে ’২৪-এর জুলাই বিপ্লব—সব যৌক্তিক আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা কলেজের ছাত্র-শিক্ষকরা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০১৮ ও ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের অংশগ্রহণ ছিল অগ্রভাগে। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঢাকা কলেজের আট ছাত্র শহীদ হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদ আ ন ম নজীব উদ্দিন খান খুররমের নামে ঢাকা কলেজের মূল অডিটরিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে সায়েন্স ল্যাব, শাহবাগসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় দুর্গ গড়ে তুলেছেন ঢাকা কলেজের ছাত্ররা।
বর্তমান শিক্ষাক্রম ও অনুষদ
বর্তমানে এইচএসসি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠ্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিভাগে প্রায় ২ হাজার ৪০০ ছাত্র রয়েছে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ২০ হাজার ছাত্রসহ ২০টি বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বর্তমান আবাসিক হলগুলো
ঢাকা কলেজে বর্তমানে আটটি হল রয়েছে—১. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস হল, ২. ইন্টারন্যাশনাল হল, ৩. উত্তর হল, ৪. দক্ষিণ হল, ৫. পশ্চিম হল, ৬. শহীদ ফরহাদ হোসেন হল, ৭. দক্ষিণায়ন হল ও ৮. বিজয় ২৪ হল
অধ্যক্ষের বক্তব্য
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, আমরা সর্বদা শিক্ষার গুণগত মান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছি। শিক্ষার মান বৃদ্ধি এবং নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।