রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল করতে হলে ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করা জরুরি। এ সময় প্রতিটি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা যখন ফুঁসে উঠছিলেন, তখন আন্দোলন দমনের দায়িত্ব নেয় বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। তারা শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আন্দোলনে অংশ নিতে বাধা দিচ্ছিল এবং তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে রাবির শিক্ষার্থীরাই প্রথম ছাত্রলীগকে তাদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করেন, যা আন্দোলনের গতিকে ত্বরান্বিত করে।
গত বছরের ১৬ জুলাই বিকাল ৪টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সব নেতাকর্মীকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাবি হয়ে ওঠে ছাত্রলীগমুক্ত প্রথম ক্যাম্পাস।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাবেক সমন্বয়কদের সঙ্গে সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে কথা হয় আমার দেশ প্রতিনিধির। তাদের বরাতে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায় ১৬ জুলাই ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে। সেদিন শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি ছিল দুপুর আড়াইটায়। তবে শিক্ষার্থীদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি নস্যাৎ করতে এক ঘণ্টার ব্যবধানে একই স্থানে জমায়েতের ডাক দেয় ছাত্রলীগ। কিন্তু সবকিছু গোপন রেখে দু-তিন ঘণ্টা আগে থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেরিয়ে আসতে বলা হয়।
এদিন দুপুর আড়াইটায় বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বিনোদপুর থেকে ২০০ থেকে ২৫০ জনের মতো শিক্ষার্থী নিয়ে একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেখানে প্রায় ১০০ জনের মতো পুলিশ সদস্য থাকলেও তারা কোনো বাধা দেননি। সে সময় ছাত্রলীগের হাত থেকে প্রতিরোধের জন্য সবার হাতে ছিল রড, পাইপ ও লাঠিসোঁটা।
তারা জানান, শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে সব হলের শিক্ষার্থীরা হল থেকে বের হতে থাকেন। বিক্ষোভ মিছিলটি জোহা চত্বরের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্যারিস রোডে এলে বিপরীত দিক থেকে কয়েকশ শিক্ষার্থী এসে মিলিত হন। মিছিলটি মেয়েদের হলের সামনে এলে হাজার দেড়েকের মতো মেয়ে শিক্ষার্থীর একটি দল তাতে যোগ দেয়।
মিছিলটি বিজ্ঞান ভবনের পাশ দিয়ে হবিবুর রহমান হলের মাঠ দিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে আসে। সে সময় শিক্ষার্থীরা হলের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হলের ভেতর থেকে প্রতিহত করতে শুরু করেন। সেখানে ইটপাটকেল খেয়ে মাদার বখ্শ হলের সামনে যায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ততক্ষণে সোহ্রাওয়ার্দী ও জোহা হলের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শাহ মখ্দুম, লতিফ ও আমীর আলী হলের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হিল গালিবকে তাড়া করেন। ফলে সাড়ে ১৫ বছরের রাজত্ব ফেলে মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সাধারণ সম্পাদক গালিবের পালানোর ১০ সেকেণ্ডের ভিডিও ব্যাপক ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হলে তার কক্ষটিতে ভাঙচুর চালান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জানান, এরপর বিক্ষোভ মিছিলটি বিজয় ২৪ হলের (তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল) সামনে এসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের রুম ভাঙচুর করে। শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুকে পুলিশ উদ্ধার করে অন্যত্র নিয়ে যায়। এ সময় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সেক্রেটারির কক্ষ এবং দপ্তর সেল থেকে তিনটি পিস্তল, ছয়টি রামদা, ১০-১৫টি মদের বোতল, কয়েকটি দাসহ রড উদ্ধার করেন বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা। পরে এসব অস্ত্র রাবি প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেন তারা।
সেদিন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পালিয়ে যাওয়া প্রত্যক্ষ করেন সাবেক সমন্বয়ক মেশকাত মিশু। তিনি আমার দেশকে বলেন, ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি ছিল দুপুর আড়াইটায়। এ কর্মসূচিকে নস্যাৎ করতে একই স্থানে জমায়েতের ডাক দেয় সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ। এ ছাড়া প্রতিটি হলের সামনে চেয়ার পেতে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে তারা। কয়েকটি হলের গেটে তারা তালা মেরে দেয় যাতে হলে থাকা শিক্ষার্থীরা কর্মসূচিতে যেতে না পারেন। তাদের সব ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে সেদিন সবচেয়ে বড় আন্দোলন হয়েছিল।
তিনি আরো বলেন, কিছুক্ষণ পরই কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর একটি বিক্ষোভ মিছিল আসাদুল্লাহ-হিল গালিব ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের তাড়া করে। এতে আতঙ্কিত হয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। নিমেষেই তাদের দীর্ঘদিনের মসনদ ভেঙে খানখান হয়ে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে ছাত্রলীগমুক্ত প্রথম ক্যাম্পাস।
আন্দোলনে শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সানজিদা ঢালি। তিনি আমার দেশকে বলেন, এদিন রাবি ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে থেকে বিতাড়িত করা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল। এ ঘটনার জন্য আমাদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ১৫ তারিখ থেকেই। যদিও আন্দোলনের সময় নির্ধারণ ছিল ১৬ জুলাই বেলা ৩টা। তবে ছাত্রলীগের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আমরা গোপনে সময় এগিয়ে এনে দুপুর আড়াইটায় আন্দোলন শুরুর সিদ্ধান্ত নেই। মেয়েদের হলগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় আমাকে। সে অনুযায়ী আমি দুপুর ১টা থেকেই মন্নুজান হলে ঘণ্টা বাজিয়ে ডাকাডাকি শুরু করি এবং আন্দোলনের জন্য মেয়েদের জড়ো করতে থাকি। পরে একত্রিত হয়ে আমরা অন্য হলগুলোয়ও যাই এবং স্লোগানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আহ্বান জানাতে থাকি।
তিনি আরো বলেন, সব হলের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে যখন মন্নুজান হলের সামনে অবস্থান নেন, তখন দেখি ছেলেরা প্যারিস রোড হয়ে মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসছে। আমরা মেয়েরা ওই মিছিলে যুক্ত হই এবং একসঙ্গে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করি। আমাদের মিছিলটি এতটাই বড় ও শক্তিশালী ছিল যে, ছাত্রলীগ তখন ভয়ে পালিয়ে যেতে শুরু করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, ১৬ জুলাই আমরা সর্বপ্রথম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করি। এরপর ওই দিন রাতে ও পরদিন সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করা হয়। মূলত ছাত্রলীগকে বের করার মাধ্যমেই ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান রচিত হয়।