রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (এসএসএমসি) মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের সংঘর্ষের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেলের বিরুদ্ধে চিকিৎসকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। তবে হিমেলের অনুসারীদের দাবি, সংঘর্ষের ঘটনায় তিনি নিজেও আহত হয়েছেন এবং তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বুধবার থেকে চিকিৎসক লাঞ্ছনার ঘটনায় বিচার চেয়ে ৪ দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেছেন হাসপাতালটির ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
হাসপাতাল সূত্র ও চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাতে অসুস্থ এক রোগীকে মিটফোর্ড হাসপাতালে আনা হয়। ভর্তিসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগলে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এসএসএমসি মিটফোর্ড হাসপাতাল ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) এক বিবৃতিতে অভিযোগ করে, ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তি সার্জারি ভবনের ৪২৯ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করে সহকারী রেজিস্ট্রার, ট্রেইনি ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। সংগঠনটি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছে।
হাসপাতালের একাধিক ইন্টার্ন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘটনার সময় উপস্থিতদের মধ্যে মেহেদী হাসান হিমেলও ছিলেন। একজন চিকিৎসকের দাবি, উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে হিমেল নিজের পরিচয় দিয়ে বারবার বলছিলেন, “আমাকে চিনস? আমি জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক।”
তবে ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ডা. দেবাশীষ চক্রবর্তী বলেন, “ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ না থাকায় কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
সংঘর্ষের একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে চিকিৎসকদের প্রতিরোধের মুখে হিমেল হাসপাতালের একটি টয়লেটে আশ্রয় নেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে তাকে সেখান থেকে বের করে আনা হয়।
এদিকে ঘটনার পর আহত অবস্থায় হিমেল ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন রাজধানীর ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অমির নামে ৪০১৩ নম্বর কেবিন নেওয়া হয়, যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন অর্নব নামে একজন। একই সময়ে ৪০১৮ নম্বর কেবিনও নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা গ্রহণের পর বুধবার দুপুরে তারা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় ফিরে যান।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, বুধবার ক্যাম্পাসে হিমেল ভাইকে দেখার সময় তার ঘাড় ও গলায় আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা গেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের সময় তিনি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ঘটনার প্রতিবাদে চার দফা দাবি ঘোষণা করেছে ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— প্রতিটি ওয়ার্ড ইউনিটের বাইরে অন্তত চারজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন, হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
সংগঠনটি জানিয়েছে, দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত জরুরি বিভাগসহ হাসপাতালের সব বিভাগে তাদের কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, “ঘটনাটি যেভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে, বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। ইতোমধ্যে মীমাংসা হয়েছে।"
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, “রাতে একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি।”