শিক্ষার্থীর সাফল্যে আনন্দ পান, বিপদে পাশে দাঁড়ান আর স্বপ্নপূরণের পথে সাহস জোগান—এমন মহৎপ্রাণ শিক্ষকতার ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন ও মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান। শ্রেণিকক্ষের পাঠদান শেষ হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়া এবং গবেষণায় এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বটিকে নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের প্রতি এই দায়বদ্ধতা, গবেষণা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে তাঁকে ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাটাগরিতে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য তাকে এই সম্মাননা জানানো হয়।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেওয়া হয়।
১৯৮৭ সালে বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদ থেকে স্নাতক এবং ১৯৯১ সালে মাইক্রোবায়োলজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ড. বাহানুর রহমান। একই বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে জাপান থেকে পিএইচডি এবং তাইওয়ান ও জার্মানিতে পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন তিনি। ২০০৫ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আগামীর পথচলা সুগম করাকে তিনি সবসময় নিজের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন।
শিক্ষার্থীদের প্রতি তার এই সংবেদনশীলতার পেছনে রয়েছে তাঁর নিজের জীবনের কঠিন সংগ্রাম ও স্মৃতির অভিজ্ঞতা। ১৯৭১ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি বাবাকে হারান। অসহায়ত্ব, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার কারণে শিক্ষার্থীদের কষ্টের বাস্তবতা তার কাছে কেবল কোনো গল্প নয়। শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা শুনলে অনেক সময় তিনি নিজের জীবনের সংগ্রামের দিনগুলোর মিল খুঁজে পান। সম্ভবত সে কারণেই বিপদে পড়া শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো তাঁর কাছে কোনো অতিরিক্ত দায়িত্ব নয়, বরং শিক্ষকতারই একটি স্বাভাবিক অংশ।
শ্রেণিকক্ষেও তার পাঠদানের ধরণ গতানুগতিক নয়। ক্লাসের প্রথম কয়েক মিনিট পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের সময়ের মূল্য, শৃঙ্খলা, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায়বদ্ধতার নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। এরপর মূল পাঠে প্রবেশ করে নিজে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে বিষয়গুলো অত্যন্ত সহজভাবে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। ক্লাস শেষে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান, ‘আজকের ক্লাস কত শতাংশ বুঝেছ?’ শিক্ষার্থীরা বিষয়টি ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পেরেছে জানালেই তিনি প্রকৃত আত্মতৃপ্তি পান।
তবে শ্রেণিকক্ষের বাইরের কিছু মানবিক ঘটনা তার শিক্ষকতার পথচলাকে সবচেয়ে বেশি বর্ণিল করেছে। করোনার সময়ে এক শিক্ষার্থীর বাবার পান বিক্রির দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার পরিবার চরম অভাবে পড়েছিল। মাস্টার্স শেষ করেও চাকরি না পেয়ে ওই শিক্ষার্থী সহযোগিতার জন্য ড. বাহানুর রহমানের শরণাপন্ন হন। শিক্ষকতা ছাপিয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে একটি প্রতিষ্ঠানে ওই শিক্ষার্থীর চাকরির ব্যবস্থা করেন এবং গবেষণাপত্র প্রকাশে উৎসাহিত করেন। বর্তমানে সেই শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন।
আরেক এতিম ছাত্রী মাস্টার্স শেষে চাকরির অনিশ্চয়তার কথা জানালে তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে মেয়েটির অসহায়ত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করেন। মেয়েটিকে মাস্টার্সে ভর্তি করানোর পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করে দেন এবং বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করেন। বর্তমানে সেই ছাত্রী প্রাণিসম্পদ খাতের ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করে তুলতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন ড. বাহানুর রহমান। ২০০২ সাল থেকেই তিনি মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব শিক্ষার্থীদের জন্য সার্বক্ষণিকভাবে উন্মুক্ত রাখার উদ্যোগ নেন। বর্তমানেও রাত পর্যন্ত সেখানে শিক্ষার্থীরা গবেষণা চালিয়ে যান। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, ভ্যাকসিন, প্রোবায়োটিক ও হাঁসের ডাক প্লেগ নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি কৃষক ও প্রাণিসম্পদ খাতের সরাসরি উপকারে আসে এমন গবেষণাকে তিনি সবসময় বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। ডিন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি আন্তর্জাতিক ইন্টার্নশিপ ও এক্সটার্নশিপ কার্যক্রমও পুনরায় চালু করেছেন।
এই সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে অধ্যাপক ড. বাহানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আমাকে গুণী শিক্ষক নির্বাচিত করায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। একই সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ আরও অনেক বেড়ে গেছে। আমি আশা করি, এই সম্মানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব শিক্ষক সম্মানিত হবেন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও গবেষণার কার্যক্রম আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে যাবে।
তিনি আরো বলেন, ছাত্র-শিক্ষকের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনে আমরা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই। এর মাধ্যমে দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হবে, যারা সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে ল্যাবরেটরিগুলোকে আরও আধুনিক করা প্রয়োজন। এতে উৎপাদনশীল ও উদ্ভাবনী গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের হয়ে উঠবে।