আওয়ামী সরকারের বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন ও জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী শিক্ষাকার্যক্রমে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে আগামী ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীরা। বিশেষ করে ২০২৫ সালে নবম শ্রেণির পরিমার্জিত পাঠ্যবই পেতে এসব শিক্ষার্থীর প্রায় তিন মাস বিলম্ব হয়েছে।
ফলে এসএসসির সিলেবাসের প্রথম বছরের অংশ শেষ করতে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছে তাদের। একইভাবে চলতি বছর দশম শ্রেণিতে ওঠার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ, রমজানের ছুটিসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ক্লাস কার্যক্রম হয়নি।
অন্যদিকে বিগত সময়ের তুলনায় তিন মাসেরও বেশি সময় এগিয়ে আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণা করেছে সরকার। এ সময়ের মধ্যে পরীক্ষার কাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতি নিতে শিক্ষার্থীদের চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে পরীক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপসহ জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং প্রয়োজনে এসএসসি পরীক্ষার সূচি একবারের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে তা এগিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা।
সূত্রমতে, বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই শিক্ষাবর্ষ ডিসেম্বরেই শেষ করার মাধ্যমে সেশনজট কমানোর পরিকল্পনার কথা জানান এহছানুল হক মিলন। এরই অংশ হিসেবে তিনি আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরেই নেওয়ার ঘোষণা দেন। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পর সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা এবং ৬ জুন থেকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরুর সিদ্ধান্ত এবং রুটিনও প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে আনা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার সূচি নিয়ে এখনো সমালোচনা অব্যাহত আছে।
যদিও এ বিষয়ে গত ৮ জুন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আগামী এসএসসি পরীক্ষার পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের জুনের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ হয়ে যাবে। সেশনজট পুরোপুরি দূর করতে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে ২০২৭ সালের ৭ জানুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরু এবং ৮ ফেব্রুয়ারি শেষ করার একটি খসড়া রুটিন তৈরি করা হয়েছে। তবে রুটিনটি নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের প্রতিক্রিয়া ও মতামত আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। প্রয়োজনে ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা রোজার আগেই শেষ হোক এটা স্টেকহোল্ডাররাই চেয়েছিলেন। সে অনুযায়ী ৭ জানুয়ারি থেকে এই পরীক্ষা শুরু করার জন্য রুটিন করেছি। এখন পর্যন্ত সেটাই আছে। এখন যদি আবার স্টেকহোল্ডাররা বলেন, তাহলে আলোচনা করা হবে। তবে ঘোষিত রুটিন এখনো পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একজন কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ আমার দেশকে বলেন, স্কুলের ক্লাস-পরীক্ষার সময় হিসাব করেই শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম ঠিক করা হয়। তবে কোনো কারণে শিক্ষার্থীরা পড়ার জন্য সেই নির্ধারিত সময় না পেলে সিলেবাস শেষ করতে তাদের জন্য চাপ সৃষ্টি হয়। এতে পরীক্ষার ফলাফলেও প্রভাব পড়তে পারে।
আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, গত বছর এমনিতেই নবমের পাঠ্য বই দেওয়া শেষ করতে মার্চ লেগে যায়। ওয়েবসাইটে বই পাওয়া গেলেও তা ব্যবহারের সংখ্যা খুব কম। ফলে এসব শিক্ষার্থীর পড়ালেখায় ঘাটতি হয়েছে। অন্যদিকে এসএসসি পরীক্ষার সূচি এগিয়ে আনায় তাদের প্রস্তুতি নিতে বেশ কষ্ট হবে। এই সূচি ৪/৫ বছর ধরে আস্তে আস্তে আগালে ভালো হতো বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একই ধরনের মন্তব্য করে কুষ্টিয়া সরকারি জিলা স্কুলের একজন সিনিয়র শিক্ষক আমার দেশকে জানান, শিক্ষাবর্ষ অনুযায়ী আমরা ক্লাসে সিলেবাস শেষ করে দিই। তবে এবার নানা কারণে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় এমনিতেই ঘাটতি আছে। এজন্য পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে না এসে প্রাইভেট কোচিং বা বাসায় বসে পড়ালেখা করছে। এই চাপ কমাতে এসএসসির সূচি আস্তে আস্তে এগিয়ে আনা ঠিক হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে রাজধানী ও খুলনার দুটি সেরা স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তথা আগামী বছরের দুইজন এসএসসি পরীক্ষার্থী আমার দেশকে জানান, আমাদের এসএসসি পরীক্ষা আগামী বছরের জানুয়ারিতে হওয়ার ঘোষণায় খুব টেনশনে আছি। এমনিতেই ক্লাসে শিক্ষকরা ঠিকমতো পড়ান না, তারা কোনোরকমে সিলেবাস শেষ করে দেন। তবে বাস্তবে এই সিলেবাস শেষ করতে আমাদের অনেক চাপ পড়ছে। দেরিতে নবমের বই পাওয়া ও এসএসসি পরীক্ষার সময় অনেক আগানোর কারণে এই চাপ পড়ছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
এসব বিষয়ে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, যথাসময়ে শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা ভালো। তবে শিক্ষার্থীদের পড়ায় ঘাটতি রেখে পরীক্ষায় বসতে হলে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী তাদের সফলতা অনিশ্চয়তায় পড়বে। কারণ, এমনিতেই স্কুলে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আনতে পারেন না। তাই সবকিছু বিবেচনা করেই এসএসসি পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয় গত ২১ এপ্রিল। আর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে আগামী ২ জুলাই।