রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট সমাধানে ২০১৭ সালে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করে কর্তৃপক্ষ। সাড়ে পাঁচ বছরে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় পেরিয়ে গেছে প্রায় এক দশক। এর মধ্য প্রকল্পের মেয়াদ তিন দফা বাড়ানো হলেও শেষ হয়নি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনার নির্মাণকাজ। নির্মাণাধীন আবাসিক হলগুলো চালু না হওয়ায় আবাসন সংকটের চাপও কমছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ৩৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। এর আওতায় অপরাজিতা হল, বিজয়-৭১ হল, ১০ তলা শিক্ষক কোয়ার্টার, ২০ তলা একাডেমিক ভবন, ড্রেন ও শেখ রাসেল মডেল স্কুলসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। পরে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ব্যয় বিবেচনায় প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। ২০১৯ সালে একনেকে প্রকল্পটির জন্য ৫১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়।
তখন প্রাথমিকভাবে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে করোনা মহামারি, নির্মাণকাজে ধীরগতি, একজন শিক্ষার্থী ও দুই শ্রমিকের মৃত্যুসহ বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। সবশেষ তৃতীয় দফায় আরো এক বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় শেখ রাসেল মডেল স্কুল ও কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। তবে আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন ও শিক্ষক কোয়ার্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক ওবায়দুল ইসলাম এসব বিষয় নিশ্চিত করেছেন।
হল নির্মাণে ধীরগতি
বিজয়-৭১ আবাসিক হলের প্রায় ৯৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক ওবায়দুল ইসলাম জানান, হলটির কিছু কাজ ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন বাকি রয়েছে। একটি পাম্প স্থাপনের বিষয়টি মূল প্রাক্কলনে না থাকায় সংশোধিত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হলটি বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা শেরেবাংলা ফজলুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের একাংশকে নির্মাণাধীন বিজয়-৭১ হলের অংশবিশেষে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ছাত্রীদের জন্য নির্মাণাধীন অপরাজিতা হলের (শেখ হাসিনা হল) কাজও শেষ হয়নি। হলটির প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর। ভবনটির ৯ তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হলেও ফিনিশিংসহ বেশকিছু কাজ বাকি রয়েছে।
নির্মাণ মান নিয়ে প্রশ্ন
বিজয়-৭১ হল ও ২০ তলা একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ করছে মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি নির্মাণাধীন বিজয়-৭১ হলের একটি অংশের ছাদ ধসে পড়ে। পরে বিভিন্ন দেয়াল ও পিলারে ফাটল এবং কয়েকটি স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ার অভিযোগ ওঠে। এতে নির্মাণ মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলেও পরিদর্শনে গুরুতর কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ওবায়দুল ইসলাম।
এদিকে ১০ তলা শিক্ষক কোয়ার্টারের নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রথম দফার পরীক্ষায় প্রশ্ন ওঠায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে এলজিইডি ও বুয়েটের মাধ্যমে আরো দুই দফা পরীক্ষা করা হয়। সবশেষ পরীক্ষায় নির্মাণসামগ্রীর শক্তিমাত্রা নির্ধারিত মানের মধ্যে পাওয়ার পর কাজ পুনরায় শুরু হয়। বর্তমানে ভবনটির প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
২০ তলা একাডেমিক ভবনের কাজ এগিয়েছে আরো ধীরগতিতে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী ভবনটির প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ১৬ তলা পর্যন্ত ছাদ এবং ১৭ তলা পর্যন্ত কলাম নির্মাণ করা হয়েছে।
ওবায়দুল ইসলাম জানান, ভবনটির মূল প্রাক্কলনে থাকা রড দিয়ে ১৭ তলা পর্যন্ত কাজ করা সম্ভব হয়েছে। পরবর্তী তিনতলার জন্য প্রয়োজনীয় রড প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় অতিরিক্ত রডের অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। এ কারণে কয়েক মাস ধরে ভবনটির মূল নির্মাণকাজ প্রায় বন্ধ রয়েছে।
প্রাক্কলন ও অনুমোদনে জটিলতা
প্রকল্পের ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে প্রাক্কলন ও নকশার ত্রুটি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে সময় লাগাকে উল্লেখ করেছেন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক। তিনি বলেন, পুরোনো প্রাক্কলনে কিছু প্রয়োজনীয় আইটেম বাদ পড়েছিল। পরে সেগুলো যুক্ত করতে ভেরিয়েশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, প্রকল্পের জন্য নতুন করে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে না। বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব। তবে প্রাক্কলনে বাদ পড়া কাজ ও উপকরণ যুক্ত করতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করতে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।