ঢাবির আইন বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগের নির্ধারিত মানদণ্ড উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের সুপারিশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ৫ মে সিলেকশন বোর্ডের সভায় ২৪ প্রার্থীর মধ্য থেকে ছয়জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। বোর্ডে উপস্থিত ছিলেন ঢাবির উপউপাচার্য (শিক্ষা) ড. আব্দুস সালাম, আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও ডিন অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দীন খান, বর্তমান ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ ইকরামুল হক, বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এবং সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপন।
নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী অনার্স ও মাস্টার্সের ফলাফল, ব্যাচ পজিশন, গবেষণা প্রকাশনা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই করার কথা। অভিযোগ উঠেছে, এসব মানদণ্ড উপেক্ষা করে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সমন্বিত ফলাফলে শীর্ষে থাকা তাসনিম নাজিয়া, তাসনিম নুসরাত রেজা, আবুজার গিফারী, মাকসুদা সরকার, আব্দুর রহমান মজুমদার, সাদমান রিজওয়ান অপূর্ব, সুরাইয়া ফেরদৌস ও ঐশী রহমানের মধ্যে কয়েকজনকে সুপারিশ করা হলেও বাকিদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা মনিরুজ্জামান, আসাদুল্লাহিল গালিব ও আলী মাশরাফকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, সুপারিশপ্রাপ্ত ছয়জন হলেন—মনিরুজ্জামান, মাকসুদা সরকার, আব্দুর রহমান মজুমদার, আলী মাশরাফ, তাসনিম নুসরাত রেজা ও আসাদুল্লাহিল গালিব।
এদের মধ্যে মনিরুজ্জামানের একাডেমিক ফলাফল অনার্স ৩ দশমিক ৫১ ও মাস্টার্স ৩ দশমিক ৭৫; মোট ৭ দমশমিক ২৬, যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তিনি সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান এবং আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে প্রিডেটরি জার্নালে গবেষণা প্রকাশের অভিযোগও উঠেছে।
প্রিডেটরি জার্নাল হলো এক ধরনের ভুয়া বা নিম্নমানের একাডেমিক জার্নাল, যেগুলো গবেষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। ফলে একাডেমিক লেখার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শুরু হওয়ার পর তিনি ও তার স্ত্রী মাকসুদা সরকার বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) প্রোফাইল থেকে সংশ্লিষ্ট আর্টিকেল সরিয়ে ফেলেন। যদিও জার্নালে ওই প্রকাশনার তথ্য পাওয়া গেছে। মাকসুদা সরকার নিজেও একই অভিযোগের মুখে রয়েছেন। প্রিডেটরি প্রকাশিত গবেষণা একাডেমিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, এমন অবস্থান থাকা সত্ত্বেও তাদের সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানসহ অনেকে আমার ব্যাচমেট ও বন্ধু ছিল। সে সুবাদে আওয়ামী লীগের অনেকের সঙ্গেই আমার সখ্য ছিল। তবে আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।
প্রিডেটরি জার্নালে গবেষণা প্রকাশের বিষয়ে তিনি বলেন, ভুলবশত প্রিডেটরি জার্নালে লেখা প্রকাশ করি। শুরুতে আমি এই জার্নাল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতাম না। পরে জানতে পেরে লেখা সরিয়ে নিই। আমি ওই প্রবন্ধগুলো পরে কোথাও ব্যবহার করি না।
আরেক প্রার্থী আলী মাশরাফের সমন্বিত ফল ৭ দশমিক ৪৮। অভিযোগ উঠেছে, তিনি রাজনৈতিক লবিংয়ের কারণে তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠ ছবি এবং বিভাগের আওয়ামীপন্থি শিক্ষক হাফিজুর রহমান কার্জনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাই না। কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
একই ভাবে ফলাফলে প্রথম সারিতে না থাকা সত্ত্বেও আসাদুল্লাহিল গালিবকে সুপারিশ করা হয়েছে। বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই তিনি তালিকায় এসেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবির উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, প্রিডেটরি জার্নালের প্রধান সমস্যা হলো দুর্বল রিভিউ প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, ‘যা ইচ্ছা তা পাবলিশ করে দিল, কোয়ালিটি থাকল না। এটি একাডেমিয়ায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
তিনি আরো জানান, ঢাবি এসব জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাকে প্রমোশন বা স্থায়ী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ক্রেডিট দেয় না।
সিলেকশন বোর্ডের সদস্য সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপন বলেন, নিয়োগের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সিন্ডিকেট অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। তিনি আরো বলেন, ‘বিষয়টি কনফিডেনশিয়াল। এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাই না।’
বোর্ডের অন্য সদস্যরা এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দীন খান বলেন, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) এ বিষয়ে কথা বলবেন।
বর্তমান ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ ইকরামুল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়; বরং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমি তৎপর রয়েছি।
এদিকে, মেধা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা। তাদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও একাডেমিক মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।