রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষেত্রে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। এ জন্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীজনদের সম্মিলিত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘Challenges of Rohingya Repatriation: International Politics and National Priorities’ শীর্ষক এক সেমিনারে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম আলী আশরাফ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে প্রত্যাবাসন বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং স্বয়ং রোহিঙ্গা জনগণের অভিন্ন লক্ষ্য। কিন্তু শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলো দূর করতে অর্থবহ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
উপাচার্য আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক আলোচ্যসূচিতে রাখতে জাতিসংঘ ও আসিয়ানের মতো বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি মিয়ানমারে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি মানবিক সমস্যা নয়; এটি মানবিক নিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের উন্নতি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকার যা কিছু প্রয়োজন, তা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ গত নয় বছরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অসাধারণ উদারতার পরিচয় দিয়েছে। তবে এই মানবিক উদারতাকে কোনো সমস্যার প্রতি অনির্দিষ্টকালের দায়বদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বাংলাদেশ এ সংকট তৈরি করেনি এবং বাংলাদেশ একা এর অন্তর্নিহিত সমস্যার সমাধানও করতে পারবে না।
রোহিঙ্গাদের স্থায়ী দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য নৈতিক ও কৌশলগত কোনো দিক থেকেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। পরিস্থিতির পরিবর্তনের অপেক্ষায় বসে থাকলে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য সক্রিয় ও ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করাই এখন একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। আর এই প্রচেষ্টাকে একটি সুসংহত কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই নিরাপত্তা কৌশলের মাধ্যমে সমর্থন দিতে হবে।
এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন প্রধান অতিথি।
সেমিনারে ‘Balancing Humanitarianism and National Security’ শীর্ষক প্রথম প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ রোযানা রশীদ এবং ওসমানী সেন্টার ফর পিস এন্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) ড. মো. মাহফুজুর রহমান।
এ আলোচনায় ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের চেয়ারপার্সন তুন কিন, লিলিয়ান ফ্যান এবং কক্সবাজারের একজন রোহিঙ্গা যুব প্রতিনিধি। প্যানেলটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাব এনাম খান।
এদিন, ‘Bringing Repatriation back into the Discourse’ শীর্ষক দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান এবং মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান।
ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে আলোচনায় যুক্ত হন মিয়ানমার কনফ্লিক্ট এনালিস্ট আশফাক রনি এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা রাজনীতিক ইউ অং কিয়াও মো। প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ উজ জামান।