চলতি বছরের এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষা প্রায় শেষ পর্যায়ে। গত ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ পরীক্ষায় সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ভুল প্রশ্ন বিতরণ। প্রথমদিন থেকেই বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার কিছু কেন্দ্রে ভুল বিষয় ও সেটের প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়।
এতে অনেকের পরীক্ষা বিঘ্নিত হয়। এ সময় পরীক্ষার্থীদের নানা রকম আশ্বাস দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও বাড়তি সময় দেওয়া হলেও কিছু কেন্দ্রে সেই সুযোগ পায়নি পরীক্ষার্থীরা। একের পর এক ভুলের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ১০ মে দিনাজপুরের একটি কেন্দ্রে ভুল সেট কোডের প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, নিয়মিত ও অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রশ্ন বিতরণে গোলমাল করেন কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা। একের পর এক বিভিন্ন কেন্দ্রে এ ধরনের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ও দুশ্চিন্তার পাশাপাশি অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
এ পর্যন্ত দাখিলের চেয়ে এসএসসিতেই ভুলের ঘটনা বেশি ঘটেছে। কেন্দ্র সচিব ও দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবহেলার কারণেই মূলত এ ধরনের ভুলের ঘটনা ঘটছে বলে জানায় শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে এবারের পরীক্ষা ঘিরে প্রশ্নফাঁসের গুজব, প্রতিকূল আবহাওয়া ও পরিবেশ এবং বিদ্যুৎ সংকটে মোমবাতি জ্বালানোসহ পরীক্ষার্থীদের নানা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। কিছু কেন্দ্রে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় পরীক্ষার্থীদের বেঞ্চে পা তুলে পরীক্ষা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এসএসসি পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির আমার দেশকে বলেন, প্রথমদিকে ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণের কিছু ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যায় কম হলেও ভুল হয়েছে এটাই বড় বিষয়।
ভুলের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত ও অনিময়ত এ দুই ধরনের প্রশ্ন পাঠানো হয়। দুটোই চলতি বছরের প্রশ্ন এবং সঠিক। তবে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা ভুলে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের মাঝে অনিয়মিতদের প্রশ্ন আবার অনিয়মিতদের মাঝে নিয়মিতদের প্রশ্ন বিতরণ করে ফেলেন। এটা তাদের ভুলের কারণে হয়ে থাকে। তবে ভুল ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবর্তন এবং পরীক্ষার বাড়তি সময় দেওয়া হয়।
তাছাড়া সংশ্লিষ্টদের পরীক্ষার খাতা পাঠানোর সময় তার সঙ্গে দুই ধরনের প্রশ্নই দিয়ে সতর্ক সহকারে দেখার জন্য পরীক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ভুল প্রশ্ন বিতরণে জড়িতদের পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি সব শিক্ষকেরই জানা। তারা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও তাদের অবহেলা বা গাফিলতির কারণে এ ধরনের ভুল হচ্ছে। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছি।
বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মিঞা মো. নূরুল হক বলেন, প্রথম দুটি পরীক্ষায় ভুল প্রশ্ন বিতরণের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষকদের গাফিলতির কারণেই এটা ঘটেছে। আমরা জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে কোনো পরীক্ষার্থী যাতে এজন্য বিপদে না পড়ে, সে বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে দেখছি।
সূত্রমতে, গত ২১ এপ্রিল এসএসসির প্রথমদিনেই ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণের ঘটনা ঘটে কুমিল্লার দেবিদ্বারের মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে। নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিট পর ভুল প্রশ্নপত্র পরিবর্তন করা হলে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিভাবকরা।
জানা গেছে, কেন্দ্রটিতে বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় ২০২৫ সালের ১০ জন অনিয়মিত পরীক্ষার্থীকে ২০২৬ সালের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। বিষয়টি ১০ মিনিট পর ধরা পড়লে কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বোর্ডের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রশ্নপত্র পরিবর্তন করে দেন। তবে সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
একইদিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে কানসাট সোলেমান মিঞা ডিগ্রি কলেজের ৮ নম্বর কক্ষে বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। এ বিষয়ে এক পরীক্ষার্থী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে তিন শিক্ষককে পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় প্রশাসন।
দ্বিতীয় দিনে ২৩ এপ্রিল বরিশালের উজিরপুরে ভুল প্রশ্নপত্রে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ওই কেন্দ্র সচিবসহ দুজনকে বহিষ্কার করা হয়। অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রের পরিবর্তে ২০২৬ সালের নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র দিয়ে সেখানে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ফলাফল নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়ায় আবুল কাশেম নূর জাহান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়ায় কেন্দ্রসচিব লুৎফর রহমান মানিকসহ চারজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত ২৩ এপ্রিল এসএসসির বাংলা দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষায় এ ঘটনা ঘটে। বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় অনিয়মিত ১৩ পরীক্ষার্থীকে ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রের পরিবর্তে ২০২৬ সালের প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। পরীক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলেও আমলে নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে গত ৩০ এপ্রিল মাদারীপুরের কালকিনিতে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র বিতরণে অনিয়মসহ দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে চার শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় প্রশাসন।
গত ৫ মে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এসএসসি পরীক্ষায় গুরুতর অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠে। হলের ১১৩ পরীক্ষার্থীকে ভুল সেটের প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি কেন্দ্রের দ্বিতীয় ভেন্যুতে এ ঘটনা ঘটে। পরে বোর্ডের পক্ষ থেকে কেন্দ্রসচিব ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তফা ফারুকীকে শোকজ করা হয়।
দিনাজপুরে এসএসসি পরীক্ষায় ভুল সেট কোডের প্রশ্নে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা গ্রহণের ঘটনা ঘটেছে। এজন্য শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রসচিব ও ট্যাগ অফিসারকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। গত ১০ মে ইকবাল হাইস্কুল পরীক্ষা কেন্দ্রে নির্ধারিত ‘১ নম্বর সেট’-এর পরিবর্তে ভুলবশত ‘৩ নম্বর সেট’-এর প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন বলেন, ওই কেন্দ্রের পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষাটি সংশ্লিষ্ট প্রশ্নপত্রের আলোকেই মূল্যায়ন করা হবে। এতে ফলাফলে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
ভুল সেট কোডের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পিরোজপুরের কাউখালী কেজি ইউনিয়ন সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। এতে কেন্দ্রের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
তবে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলেছে, এতে পরীক্ষার্থীদের কোনো ক্ষতি হবে না। এছাড়া কেন্দ্রের সচিবকে অব্যাহতি ও দায়িত্বে অবহেলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
চুয়াডাঙ্গা কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে দাখিলের ভুল প্রশ্নপত্রে ২২-২৫ মিনিট পরীক্ষা নেওয়ার পর অতিরিক্ত সময় না দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কেন্দ্রসচিব ও ট্যাগ অফিসারকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দেয় জেলা প্রশাসন।
গত ২৬ এপ্রিল পাবনার চাটমোহরে দাখিল পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে সাত শিক্ষককে (কক্ষ পরিদর্শক) অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। পৌর সদরের সামাদ সওদা মহিলা দাখিল মাদরাসা কেন্দ্রে গণিত পরীক্ষা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার জানান, ভুল প্রশ্নপত্রের কারণে পরীক্ষার্থীদের কোনো ক্ষতি হবে না। ঢাকা বোর্ডে এ পর্যন্ত চারটি কেন্দ্রে ভুলপ্রশ্ন বিতরণের ঘটনা ঘটেছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে চলমান এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বেশকিছু আলোচিত ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রয়েছে, ২৮ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ১১টি পরীক্ষা কেন্দ্রে মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দেওয়া, একই দিনে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এক ঘণ্টা বিলম্বে পরীক্ষা শুরু হওয়া, ভারী বৃষ্টিতে কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালা স্কুলকেন্দ্রে হাঁটু সমান নোংরা পানিতে বসেই পরীক্ষা দেওয়া উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া বাগেরহাটের শরণখোলায় সন্তান প্রসবের পাঁচ ঘণ্টা পর এবং কুড়িগ্রামে তিনদিনের নবজাতক রেখে এক মায়ের দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও বেশ আলোচিত হয়। তাছাড়া এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথমদিনেই প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে খবরটি সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। প্রশ্ন ফাঁস চক্রের হোতাকে আটকও করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।