যুক্তরাজ্যের রয়েল কলেজেস অব ফিজিশিয়ানস পরিচালিত এমআরসিপি(ইউকে) পরীক্ষায় বাংলাদেশি চিকিৎসকদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশীয় পর্যায়ে কাঠামোবদ্ধ অনলাইন প্রস্তুতি প্ল্যাটফর্মের সংখ্যাও বাড়ছে, যার একটি এডুকেয়ারকুইজ ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠিত একটি অনলাইন মেডিকেল শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম, যা এমআরসিপি পার্ট ১, পার্ট ২ এবং ইসিজি ব্যাখ্যা বিষয়ক কোর্স নিয়ে কাজ করছে। এ ধরনের প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য মূলত একটিই যুক্তরাজ্যভিত্তিক পাঠ্যক্রম-নির্ভরতা কমিয়ে দেশে বসেই কাঠামোবদ্ধ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
এমআরসিপি(ইউকে) মূলত তিনটি ধাপে বিভক্ত পার্ট ১, পার্ট ২ লিখিত পরীক্ষা এবং পেসেস (ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা)। প্রতিটি ধাপের প্রশ্ন তৈরি হয় যুক্তরাজ্যের নির্দিষ্ট স্নাতকোত্তর কারিকুলাম অনুযায়ী, এবং পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় সাম্প্রতিক ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকা ও পরীক্ষার প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে। ফলে প্রার্থীদের জন্য শুধু পাঠ্যবই নয়, বরং পরীক্ষার প্রকৃত কাঠামো অনুসরণকারী প্রশ্নব্যাংক ও কোর্স উপকরণ প্রয়োজন হয়।
আগে এই ধরনের কাঠামোবদ্ধ উপকরণের জন্য মূলত যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করতে হতো, যেখানে সময় অঞ্চলের পার্থক্য, মূল্য পরিশোধের জটিলতা এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটের অভাব একটি বাস্তব প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করত। এই শূন্যস্থান পূরণে দেশীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফর্মগুলো তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য মূল্যে, স্থানীয় সময় অনুযায়ী সহায়তা এবং বাংলাদেশি চিকিৎসকদের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে কোর্স উপকরণ তৈরি করছে।
এডুকেয়ারকুইজের প্রস্তুতি কাঠামো মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ভিডিও-ভিত্তিক কোর্স, প্রশ্নব্যাংক এবং সময়সীমাবদ্ধ মক পরীক্ষা। প্ল্যাটফর্মটিতে এমআরসিপি পার্ট ১ ও পার্ট ২-এর জন্য পৃথক প্রশ্নব্যাংক রয়েছে, যা পরীক্ষার নির্ধারিত ব্লুপ্রিন্ট অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো। এর পাশাপাশি "অ্যানিমেটেড লার্নিং সেশন" নামে একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেখানে কার্ডিয়াক সাইকেল, অ্যাসিড-বেস ভারসাম্যের মতো জটিল ও কল্পনা করা কঠিন বিষয়গুলো ভিজ্যুয়াল বা অ্যানিমেশনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয় যা শুধু লিখিত ব্যাখ্যার তুলনায় বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক বলে মনে করা হয়।
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে দুই স্তরের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় দ্রুত রিভিশনের জন্য সংক্ষিপ্ত পয়েন্ট এবং প্রথমবার বিষয়টি শেখার জন্য বিস্তারিত ব্যাখ্যা, যাতে পরীক্ষার আগে যত সময় বাকি আছে তার ভিত্তিতে প্রার্থী নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী গভীরতা বেছে নিতে পারেন। প্ল্যাটফর্মটি মোবাইল, ট্যাবলেট ও ডেস্কটপ সব মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য, এবং অগ্রগতি সব ডিভাইসে সিঙ্ক থাকে, যা নিয়মিত ডিউটি ও নাইট শিফটের মধ্যে সময় বের করে প্রস্তুতি নেওয়া চিকিৎসকদের জন্য একটি ব্যবহারিক সুবিধা।
এডুকেয়ারকুইজের মালিক ডা মুনতাছির ইবনে মবিন, এমবিবিএস, এমআরসিপি(ইউকে), একজন ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং এমআরসিপি মেন্টর, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। প্ল্যাটফর্মের কোর্স উপকরণ, প্রশ্নব্যাংক ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট প্রণয়ন ও পর্যালোচনার দায়িত্ব তার নিজের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। এ ধরনের একাডেমিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য হলো কনটেন্ট যেন প্রমিত রেফারেন্স টেক্সটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে এবং পরীক্ষার সাম্প্রতিক প্রবণতা প্রতিফলিত করে।
দেশে বসে প্রস্তুতি নেওয়ার একটি বড় সুবিধা হলো সময় ও ব্যয়ের দিক থেকে সহজলভ্যতা। এডুকেয়ারকুইজের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রার্থীরা কেনার আগে বিনামূল্যে ডেমো ব্যবহার করে দেখতে পারেন, যা কোর্সের মান ও উপযোগিতা যাচাইয়ের সুযোগ দেয়। এছাড়া কোর্স, প্রশ্নব্যাংক ও মক পরীক্ষা এই তিনটি উপাদান আলাদাভাবে অথবা একত্রে নেওয়ার সুযোগ থাকায় প্রার্থীরা নিজের প্রস্তুতির পর্যায় অনুযায়ী (যেমন নতুন করে শুরু করা, নাকি শুধু চূড়ান্ত রিভিশন) উপযুক্ত প্যাকেজ বেছে নিতে পারেন।
বাংলাদেশে কর্মরত চিকিৎসকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়মিত হাসপাতাল দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে দেশীয় ভাষা, সময় অঞ্চল ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তৈরি প্রস্তুতি উপকরণ থাকা তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে বসে মানসম্মত প্রস্তুতির সুযোগ থাকলে চিকিৎসকরা আন্তর্জাতিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও সহজে নিতে পারেন, কারণ এতে প্রাথমিক প্রতিবন্ধকতা যেমন উপযুক্ত উপকরণ খুঁজে বের করা অনেকটাই দূর হয়।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: যেকোনো প্রস্তুতি প্ল্যাটফর্ম বা কোর্স, তা যত মানসম্মতই হোক না কেন, পরীক্ষায় সাফল্য নিশ্চিত করে না। এমআরসিপি(ইউকে) একটি কঠোরভাবে মানদণ্ডভিত্তিক পরীক্ষা, যেখানে "স্কেলড স্কোর" পদ্ধতিতে ফলাফল নির্ধারিত হয় এবং চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করে প্রার্থীর নিজস্ব প্রস্তুতি, ধারাবাহিকতা ও ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতার ওপর। প্রস্তুতি প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা মূলত কাঠামো ও সহায়ক উপকরণ সরবরাহ করা, পরীক্ষার ফলাফলের নিশ্চয়তা দেওয়া নয়।
চিকিৎসা শিক্ষা খাতে অনলাইন প্রস্তুতি প্ল্যাটফর্মের প্রবণতা বিশ্বব্যাপী বাড়ছে, এবং বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এডুকেয়ারকুইজের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বর্তমানে এমআরসিপি পার্ট ১ ও পার্ট ২ কেন্দ্রিক হলেও, ভবিষ্যতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্নাতকোত্তর চিকিৎসা পরীক্ষার দিকেও কোর্স সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ধরনের সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে, শুধু এমআরসিপি নয়, বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্নাতকোত্তর যোগ্যতা অর্জনে আগ্রহী বাংলাদেশি চিকিৎসকদের জন্য দেশীয় প্রস্তুতি সহায়তার পরিসর আরও বিস্তৃত হবে।