ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে খাবারের নিম্নমান নিয়ে অভিযোগ নতুন বিষয় নয়। তবে রমজান মাসে তুলনামূলক বেশি দামে নিম্নমানের খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব। এদিকে ডাকসুর প্রতিনিধিরা ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করলেও ক্যান্টিনের খাবারের মানোন্নয়নে তাদের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
ডাকসু নির্বাচনের পরও রমজান মাসে খাবারের মূল্যবৃদ্ধি ও নিম্নমান নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, রমজান এলেই খাবারের দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয় না। এছাড়া ডাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে নির্লিপ্ত।
‘বেঁচে থাকার তাগিদে খেতে হয়। এমন খাবার গলা দিয়ে নামে না।’ ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এভাবেই হতাশা প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের এক শিক্ষার্থী।
বিভিন্ন হলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাহরিতে খাবার দাম ৭০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। অথচ একই মানের খাবার সন্ধ্যা রাতে ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হয়। কিন্তু সাহরির সময় এর দাম ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থী সাকিব আহমেদ বলেন, একই খাবার রাতে ৫০-৬০ টাকা, কিন্তু সাহরির সময় ৮০-১০০ টাকা হয় কী করে? শিক্ষার্থীরা যেন ক্যান্টিন মালিকদের হাতে জিম্মি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয় একাত্তর হলের ক্যান্টিন ম্যানেজার শাহে আলম বলেন, রমজানে বাজারে সবকিছুর দাম বেড়ে যায়। ক্যান্টিনে কোনো ভর্তুকি নেই। তাই দাম বাড়াতে হয়। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, রমজানে খাবারের দাম বাড়লেও মান বাড়েনি। তারা বলেন, ক্যান্টিনের ডাল যেন ‘হলুদ পানি’। অনেকে ভুল করে ডালে হাত ধুয়ে ফেলেন। ভাত হয় মোটা ও নিম্নমানের চালের, অনেক সময় আধা সেদ্ধ। সবজিতে থাকে বাজারের সবচেয়ে সস্তা ও নিম্নমানের পণ্য। রান্না করা মাংস কখনো কখনো প্লাস্টিকের মতো শক্ত লাগে। এমনকি কখনো কখনো পচা গরুর মাংস কিংবা মরা মুরগি রান্নার নজিরও রয়েছে।
এক কেজি মুরগি ৩০ টুকরা
বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক কেজি ব্রয়লার মুরগিকে ২৫ থেকে ৩০ টুকরা পর্যন্ত করা হয়। একটি হলের ক্যান্টিনের বাবুর্চি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাংস বেশি টুকরা না করলে খরচ ওঠে না। মাছের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম যত বেশি টুকরা করা যায়।
শুধু খাবারের মান নিয়ে অভিযোগের নয়, এসব খাবার পরিবেশন করা হয় স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তরকারিতে প্রায়ই চুল, তেলাপোকা, পোকামাকড়, কাঠের টুকরোÑএমনকি ইটের কণা পাওয়া যায়। রান্নার পরও মাছের পেটের ময়লা থেকে যায়।
মাস্টারদা সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ক্যান্টিন ও ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের মান নিয়ে কেউ গভীরভাবে ভাবলে সে আর তা মুখে নিতে পারবে না। বেশিরভাগ হলে রান্না হয় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে।
ক্ষতিকর টেস্টিং সল্টের আধিক্য
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যান্টিনে তরকারিতে ক্ষতিকর টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হয়। চাইনিজ খাবারে সীমিত ব্যবহারের উপাদান হলেও এখন তা খিচুড়ি, পোলাও, রোস্ট, মাছ, মাংস, ডাল ও সবজিসহ প্রায় সব খাবারে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সব তরকারি খেতে একই রকম লাগে।
স্যার এএফ রহমান হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মুরসালিন বলেন, সব খাবারের স্বাদ একই লাগে। দু-তিনদিন টানা খেলে একেবারে অনীহা চলে আসে। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ক্যান্টিনের এক বাবুর্চি বলেন, শিক্ষার্থীরা স্বাদ চায়, তাই মেশাই। টেস্টিং সল্ট ছাড়া হয় না। এখন পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ বেশি দিয়েও স্বাদ বাড়ানোর চেষ্টা করি।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, টেস্টিং সল্টে থাকে মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট (এমএসজি)। এটি নিয়মিত গ্রহণ করলে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, মাথাব্যথা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, শ্বাসকষ্ট, এমনকি জটিল স্নায়ুরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বলেন, অতিরিক্ত এমএসজি শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা বাড়ায়। এতে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, নার্ভের সমস্যাÑএমনকি দীর্ঘমেয়াদে জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম সাইদুল আরেফিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অতিমাত্রায় পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। খাবারে শর্করার পরিমাণ যথেষ্ট থাকলেও প্রোটিনের ব্যাপক ঘাটতি রয়ে যায়। আর রান্নায় যেভাবে নিম্নমানের ফাম অয়েল ব্যবহার করা হয় তা শিক্ষার্থীদের শরীরের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিসাধন করছে।
শিক্ষার্থীদের খাবারে নেই ভর্তুকি
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, হল ক্যান্টিনগুলোতে কোনো ধরনের ভর্তুকি দেওয়া হয় না। প্রশাসনের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট সীমিত। প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ভর্তুকি না থাকা নিম্নমানের খাবারের একটি কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা বলেন, খাবারের মান বাজে, এটা সত্য। তবে বাজেটে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাধারণত হল প্রশাসন বিষয়গুলো দেখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ পুষ্টি গবেষক অধ্যাপক ড. এম সাইদুল আরেফিন বলেন, সরকার বা যদি কর্তৃপক্ষ যদি এ খাতে ভর্তুকি না দেয় তাহলে খাবার এর চেয়ে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকেই (ইউজিসি) নিতে হবে।
নীরব ডাকসু প্রতিনিধিরা
জুলাই বিপ্লবের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হলেও ক্যান্টিনের খাবারের মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
এ বিষয়ে ডাকসুর কমন রুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আমরা এসব ব্যাপারে কথা বলতে গেলে কয়েকটি অন্তঃসারশূন্য মিটিং হয়। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।