বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছরই হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। ফলে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ক্রমেই বাড়ছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী যেতে আগ্রহী, তার মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও জাপান। এ ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ রয়েছে।
মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব, পছন্দের বিষয় এবং বৃত্তি পাওয়ার সুযোগ—এসব বিবেচনা করেই শিক্ষার্থীরা কোন দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, তা নির্ধারণ করেন। এরপর সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন।
ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে গেছেন।
বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে পড়তে যেতে চান, তাদের ভালো একাডেমিক ফলাফলের পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতার পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হয়। এসব সহায়ক পরীক্ষায় ভালো স্কোর থাকলে কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কিংবা স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি গবেষক ড. নাদিম মাহমুদ।
কোন পরীক্ষাগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা করা অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়।
ড. নাদিম মাহমুদ বলেন, ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত কোর্সের ক্ষেত্রে আইইএলটিএস ও টোফেল বেশি জনপ্রিয় হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পড়তে বিভিন্ন ধরনের ভাষাগত দক্ষতার প্রয়োজন হতে পারে।
ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত কোর্সের জন্য আইইএলটিএস ও টোফেলের পাশাপাশি এসএটি, জিআরই ও জি-ম্যাটের মতো পরীক্ষাতেও সফল হতে হয়।
এ ছাড়া জার্মানি, জাপান কিংবা চীনের মতো দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে স্থানীয় ভাষায় দক্ষতার পরীক্ষাও দিতে হয়।
জার্মান ভাষায় পরিচালিত কোর্সে ভর্তি হতে হলে টেস্টড্যাফ বা ডিএসএইচ পরীক্ষার মাধ্যমে জার্মান ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়।
আবার অনেক দেশেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ের স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) প্রোগ্রামে অনেক সময় জিআরই পরীক্ষার স্কোর প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া কিছু বিজনেস স্কুলের এমবিএ ও ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট কোর্সে ভর্তির জন্য জি-ম্যাট স্কোর চাওয়া হয়।
আইইএলটিএস ও টোফেল
উন্নত বিশ্বের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে একাডেমিক আইইএলটিএস (ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্টিং সিস্টেম) এবং টোফেল (টেস্ট অব ইংলিশ অ্যাজ এ ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ) গ্রহণ করে থাকে।
ড. নাদিম মাহমুদ বলেন, আইইএলটিএস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পরীক্ষা এবং বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে এই পরীক্ষা দেওয়া যায়।
তিনি বলেন, ‘‘এটিই ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণ পরীক্ষা হিসেবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইইএলটিএস স্কোরকে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা যাচাইয়ের একটি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করে।’’
আবার উত্তর আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে টোফেল স্কোরকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
ড. নাদিম মাহমুদ বলেন, ‘‘মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে টোফেল স্কোর চায়।’’
তবে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় টোফেল ও আইইএলটিএস—দুটো স্কোরই গ্রহণ করে থাকে।
আইইএলটিএস ও টোফেল—উভয় পরীক্ষাতেই একজন শিক্ষার্থীর রিডিং, রাইটিং, লিসেনিং ও স্পিকিং দক্ষতা যাচাই করা হয়। এসব পরীক্ষা একই দিনেই দেওয়া যায়।
আইইএলটিএস পরীক্ষা দুই ধরনের—একাডেমিক ও জেনারেল ট্রেনিং। স্নাতক, স্নাতকোত্তর কিংবা পিএইচডিতে পড়তে হলে একাডেমিক মডিউলে পরীক্ষা দিতে হয়।
এক থেকে নয়-এর স্কেলে আইইএলটিএসের স্কোর দেওয়া হয়। চারটি অংশে আলাদাভাবে পাওয়া স্কোর যোগ করে গড় হিসাবের মাধ্যমে চূড়ান্ত স্কোর দেওয়া হয়।
অন্যদিকে টোফেল পরীক্ষার মোট নম্বর ১২০। এ পরীক্ষার তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা হলো এডুকেশনাল টেস্টিং সার্ভিস (ইটিএস)।
জিআরই ও জি-ম্যাট পরীক্ষা কী ও কেন দিতে হয়
জিম্যাট (জিএমএটি) মানে হলো গ্রাজুয়েট ম্যানেজমেন্ট অ্যাডমিশন টেস্ট। ৮০০ নম্বরের এই পরীক্ষার স্কোর যুক্তরাষ্ট্রে বিজনেস অ্যান্ড কমার্স বিষয়ে মাস্টার্সে পড়ার সুযোগ পেতে আবেদনের জন্য প্রয়োজন হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশেই এমবিএতে পড়ার জন্য জিম্যাট স্কোরের প্রয়োজন পড়ে। এটি কম্পিউটারভিত্তিক একটি অনলাইন পরীক্ষা, যা বিজনেস স্কুলে পড়ার জন্য দরকার হয়।
জিম্যাটের মাধ্যমে বিশ্লেষণ ও গাণিতিক দক্ষতার পাশাপাশি কত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার দক্ষতা রয়েছে, তা যাচাই করা হয়।
পরীক্ষার জন্য জিম্যাটের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। অনলাইনে আবেদন করে নির্ধারিত দিনে অনুমোদিত কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে।
একবার পরীক্ষা দিয়ে অর্জিত জিম্যাট স্কোর দিয়ে পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত যেকোনো জায়গায় আবেদন করা যায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর কিংবা পিএইচডি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদের জন্য জিআরই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষার স্কোরের মেয়াদও পাঁচ বছর।
যুক্তরাষ্ট্রের এডুকেশনাল টেস্টিং সার্ভিস (ইটিএস) জিআরই পরীক্ষার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করে। এ পরীক্ষার তিনটি প্রধান অংশ হলো—অ্যানালিটিকাল রাইটিং, ভারবাল রিজনিং ও কোয়ান্টিটেটিভ রিজনিং।
এর মধ্যে ভারবাল রিজনিং অংশের জন্য ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, কোয়ান্টিটেটিভ রিজনিংয়ের জন্য গণিতে দক্ষতা এবং অ্যানালিটিকাল রাইটিংয়ের জন্য বিশ্লেষণী দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।
স্যাট বা এসএটি কখন দরকার
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়ার জন্য এসএটি (স্কলাস্টিক অ্যাসেসমেন্ট টেস্ট) স্কোর চাওয়া হয়। বাংলাদেশে এটি স্যাট নামে পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনের সঙ্গে স্যাট স্কোর জমা দিতে হয়।
ড. নাদিম মাহমুদ বলেন, এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা গ্রহণের জন্য কতটুকু প্রস্তুত, সেটি যাচাই-বাছাই করা হয় এই পরীক্ষার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্যাট পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য স্যাটের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়।
১৬০০ স্কোরের স্যাট পরীক্ষার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—ম্যাথমেটিকস, ক্রিটিক্যাল রিডিং ও রাইটিং।
টেস্টড্যাফ বা ডিএসএইচ কী
বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে জার্মানিতে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
দেশটির ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য আইইএলটিএস কিংবা টোফেল স্কোর জমা দিতে হয়।
তবে জার্মান ভাষায় পরিচালিত কোর্সের জন্য টেস্টড্যাফ বা ডিএসএইচ পরীক্ষা দিয়ে জার্মান ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়।
বাংলাদেশ থেকে অনুমোদিত কেন্দ্রে টেস্টড্যাফ পরীক্ষা দেওয়া যায়। তবে ডিএসএইচ পরীক্ষা দেওয়া যায় জার্মানিতে পৌঁছানোর পর সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে।
তবে জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তির ক্ষেত্রে নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করে।
বিজ্ঞান বা গণিতের মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় জিআরই স্কোর চায়। আবার ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কোর্সের জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় জিম্যাট স্কোর চেয়ে থাকে।
জাপানে কী লাগে
জাপানের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আইইএলটিএস কিংবা টোফেল স্কোর চাওয়া হয়।
তবে স্নাতক পর্যায়ে পড়ার জন্য কিছু বিশ্ববিদ্যালয় জাপানি ভাষায় দক্ষতার স্কোর চেয়ে থাকে।
এ ক্ষেত্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জাপান ল্যাঙ্গুয়েজ প্রফিশিয়েন্সি টেস্ট বা জেএলপিটি পরীক্ষা দিতে হয়।
এটিই দেশটিতে ভর্তির জন্য আবেদনকারী বিদেশি শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষার দক্ষতা পরিমাপের পরীক্ষা।
প্রতিবছর দুই বার এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করে বাংলাদেশ থেকেও এই পরীক্ষা দেওয়া যায়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা