গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে একের পর এক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, নীতিগত সংস্কার এবং প্রশাসনিক গতিশীলতার মাধ্যমে নতুন এক সম্ভাবনাময়ী, কল্যাণমুখী ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার নেতৃত্বে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করে চলছেন। বিশেষ করে শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে যুগোপযোগী সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ইতিবাচক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী এমন একজন যোগ্য, স্মার্ট ও দূরদর্শী ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছেন, যিনি অতীতে শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও সততার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। তিনি হলেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একসময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার সেই সাহসী উদ্যোগ আজও শিক্ষা প্রশাসনে একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।
বর্তমানে তিনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন এবং নতুন করে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার বিভিন্ন পরিকল্পনা ইতোমধ্যে জাতির মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। প্রথম আলো গত ২ মার্চ এক প্রতিবেদনে জানায়, শিক্ষামন্ত্রী দেশের শিক্ষা খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে শিক্ষক সংকট, পাঠদানের মান এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন।
‘Education is the most powerful weapon which you can use to change the world.’
— Nelson Mandela
এই উক্তিটি আজও বিশ্বের প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজ তার নতুন সভ্যদের সামাজিক করে তোলে। বিখ্যাত দার্শনিক জন ডিউই বলেন, ‘School is simplified, purified and better balanced society.’ অর্থাৎ স্কুল হলো একটি সরল, মার্জিত ও সুষম সমাজ। একটি সুষম ও শিক্ষিত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলেই মানুষ আদর্শবান, রীতিনীতি ও মূল্যবোধসম্পন্ন, সঠিক ধ্যান-ধারণা, ভালো আচার-আচরণ ও তার ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রতিফলন করাতে সক্ষম হয়। ফলে এর সুফল লাভ করে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত।
একটি জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষাবিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই এমন মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে, যারা আগামী বিশ্বের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে? তাই আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
আধুনিক শিক্ষা বলতে শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান অর্জনকে বোঝায় না; বরং এটি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা গড়ে তোলে। আধুনিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো—একজন শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং একজন দক্ষ ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
আজকের বিশ্বে উন্নত দেশগুলো শিক্ষাব্যবস্থাকে গবেষণা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন সরকারের সামনে তাই শিক্ষা সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, নারী শিক্ষার অগ্রগতি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মান, গবেষণার সুযোগ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকীয় ও বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এসব বিষয় বারবার উঠে এসেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন নেতৃত্বে গত এক মাসে যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তা দেশের জাতীয় পত্র-পত্রিকায় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের নেতৃত্বে শিক্ষা খাতে গতি, শৃঙ্খলা ও আধুনিকায়নের একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে।
তারপরও বাংলাদেশে একটি আধুনিক, কল্যাণমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করি।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, রোবোটিক্স এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি আজকের বিশ্বের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের কাঠামো পরিবর্তন করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অনলাইন শিক্ষা, স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল ল্যাবরেটরি এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে। কোভিড মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট দৈনিক কালের কণ্ঠের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিজিটাল শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্য নিরাপত্তা এবং শিক্ষার মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি মানবিক শিক্ষা এবং নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখা জরুরি।
কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দক্ষ জনশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ দৈনিক যুগান্তর-এর একটি মতামত নিবন্ধে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বেকারত্ব কমানো সম্ভব। সরকার যদি কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় বৃদ্ধি করতে পারে, তাহলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সহজ হবে। এতে বেকারত্ব কমবে এবং দেশের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে।
উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে বহু সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যারা গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা তহবিল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গবেষণা ও উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দেওয়া। উন্নত দেশগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু শিক্ষা প্রদানই করে না; বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা বেশি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশে গবেষণার সুযোগ ও অর্থায়ন এখনো সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম বাড়াতে হলে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহিত করার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
লেখক : অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়