হোম > ফিচার

ঢাকায় মহররম ও আশুরা উদ্‌যাপনের ঐতিহ্য

মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রয়েছে দুই হাজার বছরের বেশি সময়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য। বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে এর উল্লেখ থাকলেও ঢাকার মর্যাদা পায় ১৬১০ সালে সুবাহদার ইসলাম খান চিশতির হাত ধরে। এর আগে সুবাহ বাংলার রাজধানী ছিল রাজমহল। সুলতানি আমলে ঢাকার নিকটবর্তী সোনারগাঁয়ে ছিল রাজধানী, যেখানে বাংলার বারভূঁইয়া প্রধান ঈসা খান মসনদ-ই-আলা (১৫৩৭-৯৯) অবস্থান করতেন। ঈসা খানের পর তার সুযোগ্য পুত্র মুসাখান মসনদ-ই আলা সোনারগাঁকে শেষ রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করেন। সুবাহদার ইসলাম খান চিশতির সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে তিনি সোনারগাঁ ত্যাগ করেন এবং ইসলাম খান চিশতি ১৬১০ সালে ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করেন। ১৬১১ সালে এখানকার বাগ-এ-মুসাখান নামক স্থানে মুসা খানের বাগানবাড়িতেই ইসলাম খান চিশতির সঙ্গে আপস রফার পর মুসা খানের আবাস গড়ে ওঠে এবং সেখানেই (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলসংলগ্ন প্রাচীন মুসাখান মসজিদ) স্থানেই মুসাখান মসনদ-ই-আলার কবর অবস্থিত।

ঢাকায় শিয়া প্রভাব ও আশুরা উদযাপনের আলোচনার সুবিধার্থে আমরা এখানকার ইতিহাস নিয়ে সামান্য আলোচনা করলাম। সম্রাট আকবরের জীবনকালে ঢাকায় শুধু একবার একজন মোগল থানাদার সৈয়দ হোসেন (যাকে ঈসা খান বন্দি করেছিলেন) কিছুদিন এখানে মোগল প্রতিনিধি হিসেবে অবস্থান করেছিলেন। ঈসা খানের মৃত্যুর পর স্বল্প সময়ের জন্য আকবরের সেনাপতি মানসিংহ (১৫৫০-১৪) ১৬০১-০২-এর দিকে এখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। পরবর্তী সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় (১৬০৫-২৭) এখানে ইসলাম খান চিশতির আগমন ও রাজধানী স্থাপনের পথ ধরে নতুন মেরূকরণ শুরু হয়।

সারা বাংলাদেশে ইসলাম খান চিশতির অভিযান চলাকালে পুরো ঘটনার ইতিবৃত্ত পাওয়া যায় সেই সময়ের অভিযানের একজন সেনাপতি মীর্জা নাথান রচিত ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’ নামক গ্রন্থে। সেখানে মোগল সৈন্যরা যুদ্ধকালীন যেসব উৎসব অনুষ্ঠান পালন করতে দেখা যায়, এর মধ্যে কাপাসিয়া উপজেলার টোক নামক স্থানে নওরোজ উৎসব পালনের ঘটনাও রয়েছে। এটি হলো ইরানিদের বর্ষপূর্তির একটি অনুষ্ঠান বা বছরের প্রথম দিনটিতে উদযাপন করা হয়। তাদের এ অনুষ্ঠান ইসলামপূর্ব যুগ থেকে চলে আসছে। বাংলায় মোগল শাসনের শুরুর দিকে ইরানি সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করা যায়। তবে সরাসরি মহররম মাসে আশুরা বা ১০ মহররম পালন উপলক্ষে ঢাকায় শোকমিছিল বা মাতমজারির ধারা শুরু হয়েছে আরো অনেক পরে।

সম্রাট জাহাঙ্গীর-পরবর্তী সম্রাট শাহজাহানের সময় (১৬২৮-৫৮) তার ছেলে শাহ সুজা (১৬১৬-৬১) যখন বাংলার সুবাহদার (১৬৩৯-৬১) তখন ঢাকায় মূলত শিয়া ধারার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে।

শাহ সুজার নিজামতের নাওয়াড়া তথা নৌবাহিনীর দারোগা বা প্রধান ছিলেন মীর মুরাদ। মীর মুরাদ ১০৫২ হিজরি তথা ১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর স্মরণে ঢাকায় হোসেনী দালান নামে একটি শোকাগার ইমারত নির্মাণ করেন। এ প্রসঙ্গে ঢাকার প্রাচীন ইতিহাস লেখক মুনশি রহমান আলী তায়েশ ‘তাওয়ারীখ-ই-ঢাকা’ নামক গ্রন্থে যে বিবরণ দিয়েছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। তার ভাষায় ‘প্রসিদ্ধি আছে যে মীর মুরাদ একরাতে স্বপ্ন দেখেন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) একটি ইমামবাড়া তৈরি করছেন এবং তিনি মীর মুরাদকেও নির্দেশ দেন যেন তার স্মৃতি হিসেবে একটি ইমামবাড়া নির্মাণ করা হয়। এ স্বপ্ন দেখার পরের দিন মীর মুরাদ এ ইমামবাড়া নির্মাণ করার কাজ শুরু করেন এবং সদিচ্ছা নিয়ে এই বিরাট বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করেন। এটি একটি অত্যন্ত মনোরম দ্বিতল ভবন। এতে দুটি মিনার, দক্ষিণ দিকে বারান্দার নিচে একটি জলাশয়, উত্তরদিকে একটি প্রশস্ত মাঠের পর দেউড়ি এবং দোতলা নহবতখানা, পশ্চিমে তাজিয়া প্রভৃতির ঘর। এর সঙ্গে একটি দোতলা আলাদা ঘরে পুলিশের সেকশন। চারদিকে ঘেরার দেয়াল এবং দক্ষিণ দিকেও একটি দেউড়ি। মহররম মাসে এসব দেয়ালের তাকের ওপর প্রদীপ দিয়ে আলো জ্বালানো হয়। দালানের ওপর মেহরাব ও মিনারের উপর আয়নায় ঢাকনা লাগিয়ে আলো জ্বালা হয়। এতে দালানের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং দেখতেও সুন্দর লাগে।

তাওয়ারীখ-ই-ঢাকার লেখক মুনশি রহমান আলী তায়েশ মীর মুরাদ স্থাপিত এ শোকাগারটিতে স্থাপিত একটি পার্সি ভাষার শিলালিপির মূল ছবিসহ বিবরণ তুলে ধরেছেন। কবিতার ছন্দে লেখা শিলালিপিটিতে চারটি লাইন রয়েছে। এ লাইনগুলোয় লেখা রয়েছে—‘ওই মর্যাদাবান পরাক্রান্ত ও প্রসিদ্ধ বাদশাহের আমলে সৈয়দ মুরাদ এক হাজার বায়ান্ন সালে এ শোকাগারটি নির্মাণ করেন।’ এর বাইরে নিচে লেখা রয়েছে ‘সনাহ হিজরি ১০৫২’। এটিকে ঈসায়ী সালে রূপান্তর করলে দাঁড়ায় ১৬৪২।

ঢাকায় মহররম পালন এবং আশুরা উদযাপনের মূল ভিত্তি হলো মোগল আমলে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতের স্মরণে স্থাপিত এ ইমামবাড়াটি। সে ইমামবাড়া এবং পরে স্থাপিত ইমামগঞ্জ, মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ, সাতরওজা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে মহররমের নানা আয়োজন হয়ে আসছে। এতে শুধু যে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন অংশ নিয়ে থাকে তা নয়; বরং ঢাকাসহ সারা দেশে ইমাম হোসাইনের আদর্শের অনুসারী সব মুসলিমই কমবেশি এটি পালন করে থাকে। অনেক মুসলিম রোজা রেখে ইমাম হোসাইনের জন্য দোয়া করে থাকেন। প্রাচীনকাল থেকেই আশুরারÑঅর্থাৎ ১০ মহররমের তারিখটি সরকারি ছুটি থাকায় সবাই দিনটিকে শোক ও শক্তির উদ্বোধনের চেতনা নিয়েই স্মরণ এবং উদযাপন করে।

মোগল প্রশাসন এবং পরবর্তী নায়েব নাজিমদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকাসহ সারা দেশের নানা স্থানে ইমামবাড়া গড়ে ওঠে এবং মহররম মাসে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতি ইমাম হোসাইন (রা.)-এর স্মরণে প্রতি হিজরি বছরের মহররম মাসের ১ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত নানা ধারায় মহররমের শোক পালন করা হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ

হোসেনী দালান

যেভাবে পলাশী আসে

স্বাস্থ্যের উপ-পরিচালকের মন্তব্যে তোলপাড়, সাংবাদিকদের প্রতিবাদ-নিন্দা

কম দামে নতুন এআই স্মার্ট চশমা আসছে বাজারে

দীর্ঘক্ষণ বাইক চালালে কী হয়

মানসিক সুস্থতার ৮ উপায়

কার্ডিওজেনিক শক

এআই প্রযুক্তির প্রভাব, এক বছরে ২১ হাজার কর্মী ছাঁটাই করলো ওরাকল

প্রতিবন্ধী হয়েও যারা স্বনামখ্যাত

বাবার জন্য ভালোবাসা