দেশে রোগমুক্ত সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ নিরাপদ ভোজ্যতেল প্রাপ্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ড্রামে খোলা ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ একটি বড় বাধা। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মানসম্মত ভোজ্যতেলের বাজারজাতকরণে সব পর্যায়ে অস্বচ্ছ ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেন, দেশে ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করা হয়। ভোক্তারা তেলের রং দেখে নিশ্চিত হয়ে সেটি কিনতে চান। স্বচ্ছ প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের আড়ালে অজান্তে কী ঘটে যাচ্ছে সেই স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। তাই ভোজ্যতেলের ভিটামিন ‘এ’ সুরক্ষার জন্য স্বচ্ছ প্যাকেজিং পরিহার করে অণুপুষ্টি বজায় রাখতে দ্রুত আলো প্রতিরোধী অস্বচ্ছ প্যাকেজিং ব্যবহার একটি কার্যকরী সমাধান।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাজধানীর একটি হোটেলে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ ও মানসম্মত ভোজ্যতেল: বিশেষজ্ঞ সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনায় এ আহ্বান জানানো হয়।
লার্জ স্কেল ফুড ফর্টিফিকেশন-বাংলাদেশ কান্ট্রি অ্যাডভোকেসি প্রকল্পের কনসালটেন্ট এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ সংলাপে দেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক, রিফাইনারি প্রতিনিধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকেরা অংশগ্রহণ করেন।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক মো. ইউনুছুর রহমান, হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী,
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক মো. কুতুবুল আলম এবং কিউএ অ্যান্ড কমপ্লায়েন্সের জিএম (টিকে গ্রুপ) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।
খোলা ভোজ্যতেলের ব্যবহার প্রসঙ্গে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মলয় কান্তি মৃধা জানান, ন্যাশনাল নিউট্রিশনাল সার্ভেইল্যান্স অনুযায়ী দেশব্যাপী পরিচালিত জরিপে বর্তমানে খানা পর্যায়ে ৫১ শতাংশ পরিবার প্যাকেটজাত ভোজ্যতেল ব্যবহার করে, আর ৪৯ শতাংশ পরিবার খোলা ভোজ্যতেল ব্যবহার করে।
পথিকৃৎ ফাউন্ডেশনের চেয়ার অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী রোগতত্ত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মানবস্বাস্থ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের তেলের ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব রয়েছে। জীবনাচার, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবর্তিত সাংস্কৃতিক অভিযোজন সম্মিলিতভাবে জনস্বাস্থ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এ বিষয়ে তিনি জনস্বাস্থ্যভিত্তিক গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুলতান আলম বলেন, ডিও ডিলাররা ভোজ্যতেল সরবরাহের ক্ষেত্রে কেমিক্যালের ড্রাম ব্যবহার করে, যেগুলো শনাক্ত করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। এসব ড্রামে ভোজ্যতেল সরবরাহ বন্ধ করা গেলে ভোজ্যতেলের গুণগত মান আরও উন্নত হবে। তিনি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেকোনো গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা উচিত।
অনুষ্ঠানে ভোজ্যতেলের ভিটামিন ‘এ’ সুরক্ষার জন্য দ্রুত অস্বচ্ছ প্যাকেজিং প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশে অস্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি ইতোমধ্যে বহুল প্রচলিত। আর ভোজ্যতেল অধিকতর স্বচ্ছ করার জন্য ২৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় পরিশোধন করা হলে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে এ ধরনের তেল গ্রহণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ক্রুড (অপরিশোধিত) ভোজ্যতেল আমদানি থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে সমৃদ্ধকৃত ভোজ্যতেলের ভিটামিন ‘এ’ অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাজারজাতকরণের সব পর্যায়ে অস্বচ্ছ ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই -এর প্রতিনিধি এস. এম. আবু সাঈদ জানান- ভোজ্যতেলের প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে ফুড-গ্রেড-সংক্রান্ত সনদ, প্রোডাক্ট সার্টিফিকেশন কমিটি থেকে গ্রহণ করা আবশ্যক। তবে ফুড-গ্রেড প্রতীক ব্যবহার এখনও বাধ্যতামূলক করা হয়নি। আলোচনা শেষে কয়েকটি সুপারিশ উত্থাপন করা হয়।
সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে- রিফাইনারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় বৃদ্ধি করে শতভাগ অস্বচ্ছ ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং বিষয়ে মতভেদ হ্রাস করা; খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয় খোলা ভোজ্যতেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা; এ লক্ষে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩-এর ধারা ৮ অনুযায়ী ‘হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং বাণিজ্যিকভাবে খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকরণের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নির্দেশাবলি; জারি করা এবং ক্রুড ভোজ্যতেল আমদানির সময় পোর্ট ক্লিয়ারেন্স পর্যায়ে ভারী ধাতুর পরীক্ষা সম্পন্ন করা।
এএস