বিশ্বজুড়ে যখন মহাসমুদ্রগুলোর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে, ঠিক তখন উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি বিশাল এলাকার পানি উল্টো শীতল হয়ে যাচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের দক্ষিণে অবস্থিত সাগরের এই অংশটিকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘কোল্ড ব্লব’ বা ‘ওয়ার্মিং হোল’।
নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এই রহস্যময় শীতল অঞ্চলটি আসলে বিশ্ব জলবায়ুর একটি বড় ধরনের মহাবিপর্যয়ের আগাম ও ভয়ঙ্কর সংকেত।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস হ্রাস পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক ছিল যে-বাতাস বা মেঘের পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে তাপ হারিয়ে এমনটা হচ্ছে, নাকি তাপ পরিবহনকারী সমুদ্রস্রোতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে এটি ঘটছে।
নতুন এই গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে, এটি মূলত সমুদ্রস্রোত দুর্বল হওয়ারই লক্ষণ, যা পৃথিবীর ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিজ্ঞানীরা জানান, আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন বা ‘অ্যামোক’ নামের এই সামুদ্রিক স্রোতব্যবস্থাটি মহাসাগরের একটি বিশাল কনভেয়ার বেল্টের মতো কাজ করে। এটি ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ পানি উত্তর গোলার্ধে নিয়ে আসে। সেখানে পানি ঠান্ডা ও ঘন হয়ে নিচে তলিয়ে যায় এবং পুনরায় দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। মানুষের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলে সাগরে প্রচুর স্বাদু পানি প্রবেশ করছে, যা এই স্রোতব্যবস্থার তাপ ও লবণের সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে ব্যাহত করছে। ফলে ‘অ্যামোক’ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কিছু বিজ্ঞানীর আশঙ্কা, চলতি শতাব্দীর মধ্যেই এই স্রোতব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার মতো চূড়ান্ত বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে যেতে পারে।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, ‘অ্যামোক’ যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা বিশ্বজুড়ে বিপর্যয় ডেকে আনবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে, ইউরোপ তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও বরফের নিচে তলিয়ে যাবে এবং আফ্রিকায় মৌসুমি বায়ুর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেবে।
এই রহস্য উন্মোচনে জার্মানির পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা ও মহাসাগর বিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং গবেষণার অন্যতম লেখক স্টেফান রাহমস্টর্ফ ও তার দল স্যাটেলাইট ও বিভিন্ন যন্ত্র থেকে পাওয়া বাস্তব তথ্য এবং জলবায়ু মডেলের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তারা দেখতে পেয়েছেন, শীতলীকরণের এই প্রক্রিয়াটি কেবল সমুদ্রের উপরিভাগেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমুদ্রের গভীরেও ঘটছে, যেখানে বাতাস বা মেঘের মতো বায়ুমণ্ডলীয় উপাদানের প্রভাব খুবই কম।
অন্য কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১ হাজার বছরের মধ্যে এই স্রোতব্যবস্থাটি এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক ও বায়ুমণ্ডলীয় গবেষক রেনে ভ্যান ওয়েস্টেন এই গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, বিভিন্ন ডেটাসেটের সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল এই সিদ্ধান্তের নির্ভরযোগ্যতাকে আরো শক্তিশালী করেছে।
তবে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সমুদ্র ও জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড থর্নালি এবং যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের সিনিয়র জলবায়ু বিজ্ঞানী জোনাথন বেকার কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তাদের মতে, বাস্তব তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাপ্ত ডেটাসেটগুলোকে একদম নিখুঁত না ধরে একটি ভালো অনুমান হিসেবে দেখা উচিত।
তারা মনে করেন, এই গবেষণাটি কোল্ড ব্লবের পেছনে ‘অ্যামোক’-এর দুর্বলতার সপক্ষে বড় প্রমাণ যুক্ত করলেও, এটিই এই বিতর্কের শেষ কথা নয়।
সূত্র: সিএনএন
এএম