ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ক্যাম্পাসে নির্বাচনি উত্তেজনা ততই বাড়ছে। প্রার্থীদের নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগে মুখর হয়ে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসজুড়ে প্রার্থীদের একের পর এক সংবাদ সম্মেলন, গণসংযোগ আর বক্তব্যে নির্বাচনের গতি আরো তীব্র হয়েছে।
গতকাল দুপুরে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দাঁড়িয়ে আলোচনার জন্ম দেন স্বতন্ত্র ‘ডিইউ ফার্স্ট’ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদপ্রার্থী মাহিন সরকার। তিনি মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলন থেকে জিএস পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) মনোনীত জিএস প্রার্থী আবু বাকের মজুমদারকে সমর্থন করেন।
মাহিন সরকার বলেন, আমার প্যানেলের সবার সঙ্গে আলোচনা করেই আমি সরে দাঁড়িয়েছি। আমি মনে করি, গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতৃত্ব যদি ডাকসুতে আসে, তাহলে তারা শিক্ষার্থীদের প্রতি আরো দায়বদ্ধ থাকবে। সে কারণেই আমি আবু বাকের মজুমদারকে সমর্থন করছি।
এ সময় আবু বাকের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এই ঐক্য আরো শক্তিশালী আন্দোলনের পথ তৈরি করবে। আমরা সবার দোয়া ও সমর্থন চাই।
অন্যদিকে ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী’ প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আব্দুল কাদের অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশালীন ও অবমাননাকর আক্রমণের শিকার হচ্ছেন তিনি।
সূর্যসেন হলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে কাদের বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে অনলাইনে মা-বাবা তুলে গালাগাল বেড়েছে। সাইবার আক্রমণের কারণে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আগে ভিন্ন মতাবলম্বীরা শারীরিক হামলার শিকার হতো, এখন সেটি অনলাইন আক্রমণে রূপ নিয়েছে। অনেক গালাগাল শারীরিক আঘাতের চেয়েও জঘন্য।
তিনি ডাকসু নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রশাসনের বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি কেবল ফর্মালিটি হিসেবে রাখা যাবে না, বরং ক্যালেন্ডারভিত্তিক একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।’
কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার আবিদুলের
এদিন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের জন্য অন-ক্যাম্পাস কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবেন। তিনি বলেন, হল ও ক্যাম্পাসের দোকানগুলো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে এনে শিক্ষার্থীদের ব্যবসার সুযোগ দিলে তারা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন।
শাসনিক দপ্তরে শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দিলে একই সঙ্গে আয় ও অভিজ্ঞতা হবে। এছাড়া বছরে দুই-তিনবার জব ফেয়ার আয়োজন করে করপোরেট কোম্পানিগুলোকে ক্যাম্পাসে এনে ইন্টারভিউ নেওয়া হবে। আবিদুল ইসলাম আরো জানান, প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও তৃতীয় ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ নেবেন তারা।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসনের অঙ্গীকার সাদিক কায়েমের
ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী আবু সাদিক কায়েম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, হলে সিট না পাওয়া নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা করবেন। জুমার নামাজ শেষে ক্যাম্পাসে প্রচারণাকালে তিনি বলেন, শতবর্ষ পূর্ণ হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে আবাসন সংকট রয়ে গেছে। তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রোডম্যাপের মাধ্যমে এ সংকট সমাধানের আশ্বাস দেন। তার ইশতেহারে আরো রয়েছে—হলের খাবারের মানোন্নয়ন, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং মিল ভাউচার সিস্টেম চালু।
বড় দল মানেই দখলদারিত্ব : উমামা ফাতেমা
এদিন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা ভিন্ন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যদি কোনো বড় দল নির্বাচিত হয়, তাহলে তারা কেবল ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স করবে—ফিল্টার, ভেন্ডিং মেশিন, কল বসানোই হবে তাদের কাজ। শেখ হাসিনা গত ১৭ বছর এভাবেই করেছে। কিন্তু এতে সিস্টেমের কোনো উন্নতি হয় না, বরং ছাত্র রাজনীতিতে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
তিনি অভিযোগ করেন, হলে এখনো ‘গুপ্ত রাজনীতি’ চলছে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রশাসনিক বিধিনিষেধের কারণে প্রচারণায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন।
একাত্তরবিরোধী প্রার্থী নির্বাচিত হলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলঙ্ক : বামপন্থি প্যানেল
ডাকসু নির্বাচনে ‘অপরাজেয় ৭১, অদম্য ২৪’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী নাইম হাসান হৃদয় বলেছেন, একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হলে তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ‘লানত ও কলঙ্ক’ হবে। এদিন ক্যাম্পাসে গণসংযোগকালে তিনি বলেন, একাত্তর বিরোধীরা সুযোগ পেলেই নিজেদের আসল চেহারা দেখাবে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, কিছু প্যানেলের নেতারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পেরে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বলছে, আবার কেউ আন্দোলনের পর রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে উঠেছে। নাইম মনে করেন, আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থীদের
যোগ্যতার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মতাদর্শের প্রতি অবস্থানই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত।
বাগছাসের বিরুদ্ধে প্রতারণার
অভিযোগ হামিমের
এদিকে ছাত্রদল সমর্থিত জিএস প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম অভিযোগ করে বলেছেন, বাগছাস শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তার দাবি, বাগছাস আসলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছায়াতলে পরিচালিত হচ্ছে।
হামিম বলেন, ‘যাহা নাগরিক পার্টি, তাহাই বাগছাস। এনসিপির ফেসবুক পেজ দেখলেই বোঝা যায়, শুধু বাগছাসের প্রচারণা চলছে সেখানে। অথচ তারা দাবি করে, কোনো মাদার অর্গানাইজেশন নেই। এটি সরাসরি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বীরা একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি করছে, কিন্তু প্রকৃত প্রতারণা করছে তারাই, যারা শিক্ষার্থীদের আস্থার সঙ্গে খেলছে। ৯ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়ে এর জবাব দেবে।’
আবু বাকেরের পুরোনো ছবি ঘিরে বিতর্ক
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে বাগছাস সমর্থিত জিএস প্রার্থী আবু বাকেরের একটি পুরোনো ছবি। ২০২২ সালে শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে ছাত্রলীগের আয়োজিত একটি বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি কর্মশালায় তাকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
এই ছবি ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হলেও আবু বাকেরের সমর্থকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং বর্তমানে বাগছাসের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সব মিলিয়ে ডাকসু নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসেস এখন উত্তেজনা বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই নির্বাচন কেবল প্রার্থীদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রতিযোগিতা নয়, বরং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির নতুন ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।