তাজমহল বিশ্ববিখ্যাত এক স্মৃতিসৌধ। আস্থার সঙ্গে বলা যায়, এমন দৃষ্টিনন্দন মধ্যযুগীয় স্থাপনা দ্বিতীয়টি নেই। তাজমহল ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় অবস্থিত। মোগল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের (বেগম আরজুমান্দ বানু) স্মৃতি রক্ষার্থে এই অপূর্ব সুন্দর সৌধটি মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী আগ্রায় নির্মাণ করেন। এটি মোগল স্থাপত্যশৈলীর সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন, যার নির্মাণশৈলীতে ইসলামি, পারস্য, তুরস্ক ও ভারতীয় স্থাপত্যশিল্পের সম্মিলন ঘটেছে। তাজমহলের নকশা করেন লাহোরের বিখ্যাত স্থপতি ওস্তাদ আহমেদ। ইনি ঈশা খান নামেও পরিচিত ছিলেন। তাজমহলের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ সালে আর মূল সমাধিসৌধ নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৬৪৮ সালে। পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয় ১৬৫৩ সালে। সময় লাগে মোট ২২ বছর। নির্মাণের সময় ভারত, পারস্য, মিসর ও মধ্য এশিয়া থেকে আসা ২০ হাজার দক্ষ কারিগর ও শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেছে বলে জানা যায়। ১৯৮৩ সালে তাজমহল বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম হিসেবে ইউনেসকোর তালিকাভুক্ত হয়।
ভিত্তি ও তাজমহলের গঠন : তাজমহলের মূলে হলো তার সাদা মার্বেল পাথরের সমাধি। সমাধিটি বর্গাকার বেদিকার ওপর স্থাপিত। ভিত্তি কাঠামোটি বিশাল এবং কয়েক কক্ষবিশিষ্ট। প্রধান কক্ষটিতে মমতাজ মহল ও শাহজাহানের স্মৃতিফলক বসানো হয়েছে। ভিত্তিটি প্রতিদিকে ৫৫ মিটার লম্বা, পাশে ধনুকাকৃতির পথ, আইওয়ানের কাঠামো, সঙ্গে ওপরে একই রকমের ধনুকাকৃতির বারান্দা রয়েছে। এই প্রধান ধনুকাকৃতির তোরণ উপরে ইমারতের ছাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সম্মুখভাগ তৈরি করেছে। তাজমহলের প্রতিটি দিক একই রকম ডিজাইনে নির্মাণ করা হয়েছে। ভিত্তির প্রতিটি কোনায় একটি করে—মোট চারটি মিনার রয়েছে। মমতাজ মহল ও শাহজাহানের কবর রয়েছে সবচেয়ে নিচের তলায়।
তাজমহলের মার্বেল পাথরে নির্মিত গম্বুজ খুবই আকর্ষণীয়। এর আকার ৩৫ মিটার, যা ইমারতের ভিত্তির সমান। গম্বুজের ওপরের দিক একটি পদ্মফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে, যা গম্বুজের উচ্চতাকে আরো দৃষ্টিগোচর করেছে। গম্বুজের উপরে পারসীয় অলংকরণে অলংকৃত একটি তামার দণ্ড রয়েছে। বড় গম্বুজটির চার কোনায় রয়েছে একই রকম দেখতে আরো চারটি ছোট গম্বুজ। ছোট গম্বুজগুলোয়ও তামার দণ্ড রয়েছে। বড় গম্বুজটির ওপর মুকুটের মতো একটি চূড়া রয়েছে। ১৮০০ শতকের আগে পর্যন্ত চূড়াটি স্বর্ণের নির্মিত ছিল, কিন্তু পরে স্বর্ণেরটি সরিয়ে ব্রোঞ্জনির্মিত চূড়া বসানো হয় ।
মিনারগুলোর মূল বেদিকার কোনায় একটি করে মোট চারটি বড় চৌকি রয়েছে। প্রতিটি চৌকির উচ্চতা ৪০ মিটারেরও বেশি। চৌকিগুলো নকশা করা হয়েছে মসজিদের প্রথাগত মিনারের নকশায়, যেখানে মুয়াজ্জিন নামাজের জন্য আজান দেন। প্রতিটি মিনারকেই দুটি বারান্দা দিয়ে তিনটি সমান উচ্চতায় ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি মিনার বেদিকা থেকে বাইরের দিকে সামান্য হেলানো আছে, যাতে এগুলো কখনো ভেঙে পড়লেও যেন তা মূল সমাধির উপরে না পড়ে।