আমরা তিন ভাই ছোট বোনকে নিয়ে যাচ্ছি রাঙামাটিতে। পাহাড় দেখতে। পাহাড়ি রাস্তাটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে শহরে চলে গিয়েছে। মেজো ভাই গাড়ি চালাচ্ছেন। গাড়িটা শাঁ শাঁ করে চলছিল পাহাড়ি পথ ধরে। পাহাড়ে আদিবাসীদের মেলা চলছে। দুপাশে ঘনজঙ্গল। হঠাৎ রেশমা বলল, ‘দ্যাখো ভাইয়া, রাস্তার ওপর একটা লোক দুহাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে!’ মাঝবয়সি একটা লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছে।
মেজো ভাই বিরক্ত মুখে বললেন, ‘ধুত্তোরি, কোত্থেকে এলো যে লোকটা?’
গাড়ি থামাতেই লোকটা ছুটে এলো। তালিস্নমারা একটা কোট গায়ে। মাথায় পুরোনো হ্যাট। মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখদুটো মায়াবি। টলটলে।
লোকটা করুণ গলায় বলল, ‘স্যার, আপনাদের কাছে রক্ত বন্ধ করার কোনো ওষুধ আছে?’
সবাই অবাক! বড় ভাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন, কী দরকার?’
‘স্যার, একটা খরগোশ পায়ে আঘাত পেয়েছে। রক্ত ঝরছে পা থেকে। খরগোশটার পায়ে ওষুধ লাগাতে পারলে বাঁচাতে পারতাম।’
‘লোকটা পাগল নাকি!’ মেজো ভাই বললেন, ‘আমাদের কাছে তো অমন কোনো ওষুধ নেই।’
লোকটা বলল, ‘কোনো ওষুধ নেই! আপনাদের বিরক্ত করলাম। কিছু মনে করবেন না। কোনো ঘাসের রস লাগিয়ে দেখি খরগোশটার রক্ত পড়া বন্ধ করা যায় কি না।’
লোকটা ধীরপায়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেল।
দুই.
মেজো ভাই গাড়ি চালাতে লাগলেন। আবছা কুয়াশার মতো নজরে এলো রাঙামাটি শহর।
একসময় পৌঁছে গেলাম আগেই বুক করা রেস্ট হাউসে। চারপাশে শিরীষ গাছের সারি। ঝরাপাতা রেস্ট হাউসের সামনের কাঁকরবিছানো পথটা ভরে রেখেছে।
সন্ধ্যা নামার আগেই সবাই মেলা দেখতে চলে গেল। আমি রাঙামাটি শহর দেখার জন্য বের হলাম। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ দেখি সেই লোকটা বাস থেকে নামছে। হাতে দুটো খাঁচা। খাঁচায় নানা প্রজাতির পাখি। কোনো পাখির ডানা ভাঙা, কোনোটার পা দুমড়ে গেছে। কোনোটার চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছে।
রাতের ঝড়ে পাখিগুলোর এমন দশা হয়েছে।
লোকটা পাখিগুলো নিয়ে কোথায় যাচ্ছে? বাজারে বিক্রি করবে! কৌতূহলী হয়ে তার পেছন পেছন চললাম। একজন লোক তাকে দেখে চেঁচিয়ে বলল, ‘জলিল ভাই, মরা পাখিগুলো জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে এনেছো বুঝি?’
লোকটা বলল, ‘মরা পাখি মানে! সবগুলো বেঁচে আছে। ঝড়ের কবলে পড়ে সারারাত কী কষ্টে ছিল পাখিগুলো, তার তুমি কী বুঝবে? আহা, এই হলুদ পাখিটার একটা ঠ্যাং বুঝি ভেঙেই গেছে।’
‘তা যাচ্ছো কোথায় পাখিগুলো নিয়ে? বিক্রি করবে নাকি?’
‘বিক্রি করব মানে? আমি পাখি বিক্রি করি নাকি! ওই মংলা বুড়োর কাছে যাচ্ছি। সে পাহাড়ি লতাগাছ ছেঁচে অদ্ভুত ওষুধ বানাতে পারে। ওই ওষুধ লাগালেই পাখিগুলো সুস্থ হয়ে আবার আকাশে উড়বে।’
লোকটার চোখদুটো চকচক করে উঠল। তারপর আনমনে আকাশের দিকে তাকাল।
তিন.
লোকটা আকাশ দেখছে। অপরাজিতার মতো নীল আকাশ। আকাশে অনেক পাখি ডানায় রোদ মেখে উড়ছে। সোনাকুঁচির মতো উড়ছে।
লোকটা নিশ্চয়ই পাখিদের খুব ভালোবাসে। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘জলিল ভাই, আপনার খরগোশটার রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে?’
লোকটা আমাকে চিনতে পেরে বলল, ‘আপনি বুঝি সেই জিপটায় ছিলেন।’
আমি বললাম, ‘ঠিক চিনতে পেরেছেন।’
লোকটা বলল, ‘খরগোশটা সুস্থ হয়েছে স্যার, বেচারার খুব কষ্ট হচ্ছিল। পশুপাখিদের দুঃখ আমি সহ্য করতে পারি না। ওরা তো ওদের কষ্টের কথা আমাদের বলতে পারে না।’
‘আপনার খুব মায়া লাগে?’
‘লাগবে না মানে? ওদের আমি ভালোবাসি। আমরা তো ওদের নিরাপদ আবাস দিতে পারিনি। আমার শুধুই মনে হয় পাহাড়ি আর বাঙালিদের মধ্যে যুদ্ধ হলে, জঙ্গলের পশুপাখি মারা পড়বে।’
চার.
সন্ধ্যা নেমেছে পাহাড়তলিতে। শিরীষ গাছের বুক চিরে শাঁ শাঁ বাতাস বইছে। জলিল ভাইয়ের বিষাদভরা কণ্ঠ কানে আসছে। যুদ্ধে পশুপাখিরা মারা পড়বে ভেবে সে আতঙ্কিত!
‘আমি স্যার ছোটবেলা থেকেই বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই। জঙ্গল আমাকে পাগলের মতো টানে। এ পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। পশু-পাখিরাই আমার সব। কোন পাখি কষ্ট পাচ্ছে; কোন খরগোশ আহত হয়েছে; কোন বেজি মারামারি করে রক্তাক্ত হয়েছে—তাদের সেবা করে আনন্দ পাই। তাদের কষ্ট অনুভব করি।’
আমি বললাম, ‘খুব মহৎ কাজ করেন আপনি।’
লোকটি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যখন মুক্ত আকাশে পাখিরা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, তখন ভারী আনন্দ হয় আমার। যাই স্যার, মংলা বুড়ো চোখে কম দেখে। বেশি রাত হলে তার অসুবিধা হয়।’
পায়েচলা পথ ধরে চলে গেল লোকটা। দুহাতে খাঁচাভর্তি আহত পাখি।
নীল আকাশে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখতে ভালোবাসে সে।
কদিন পর আমরা ঢাকায় ফিরি। কিন্তু জলিল ভাইয়ের মায়াভরা চোখদুটো আর আহত পাখিগুলো আমার মস্তিষ্কে অনুরণন ছড়াতে লাগল।