হোম > ফিচার > স্বাস্থ্য

অপ্রয়োজনীয় টেস্ট, দায় কার?

ডা. মো. কামালউদ্দিন

একজন রোগী চিকিৎসা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম তিনটি বা তিনটি পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান রয়েছে। প্রথমে রোগীর ইতিহাস (History Taking) জানতে হয়। এরপর রোগীর গায়ে পরীক্ষা (Physical Examination) করতে হয়। সবশেষে রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Investigations)। এত কিছুর পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ে (Diagnosis), মাঝেমধ্যে ধরা পড়ে না। কিছু পরীক্ষা আবার (Repeat) করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের বেশির ভাগ চিকিৎসকই রোগীর আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় টেস্টও কোনো কোনো সময় কম দেন। সেই যে কিছু রোগ ধরা পড়ে না, সেগুলো সেই পরীক্ষায় ধরা পড়ে। সব ক্ষেত্রে যে শতভাগ রোগ ধরা পড়ে, তা কিন্তু নয়।

অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে একটা তত্ত্ব আছে। যাকে ‘তুষারখণ্ডের উপরিভাগ ভেসে ওঠা তত্ত্ব’ যা ইংরেজিতে Tip of Iceberg Phenomena নামে পরিচিত। অর্থাৎ রোগের সামান্য অংশই লক্ষ্মণ হিসেবে দেখায়, যার বেশির ভাগই শরীরে লুকিয়ে থাকে। অল্প পরীক্ষায় কারোটা ধরা পড়ে গেলে সে ভাগ্যবান। আর ধরা না পড়লে সঠিকটা খুঁজে আনতে তাকে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এতে কারো দোষ দেখি না, না রোগীর, না চিকিৎসকের। যদি কারো দোষ দিতেই হয়, সেটি নিয়তির। ভাগ্যের লিখন, না যায় খণ্ডন।

আমার রোগীকে ভালোভাবে দেখবেন

বাবা-মায়ের কাছে সন্তান যে রকম, একজন চিকিৎসকের কাছে রোগী অনেকটা সে রকম। কয়েকটি উপমায় ব্যাপারটি ক্লিয়ার হবে। একজন ব্যস্ত চিকিৎসকের কাছে গেলেন। তিনি আপনার কাছ থেকে কথা শুনে, পরীক্ষা করে, টেস্ট দিয়ে চিকিৎসা দেবেন। তার মনে একটা চেক লিস্ট আঁকা থাকে। তার আলোকে তিনি আপনার অসুখটা জাজ করে থাকেন। আবার ধরুন আপনি কারো ব্যক্তিগত চেম্বারে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিতে গেলেন। এতে তিনি মনে মনে নাখোশ হলেও আপনাকে সেবায় কোনো কমতি তিনি দেবেন না।

এভাবে একজন চিকিৎসক তৈরিই হয়নি। ধরুন আপনি একজন সেলিব্রিটি, গিয়েছেন একজন খুবই নতুন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারে। আপনাকে বিশেষভাবে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। হয়তো তার চোখে-মুখে আপনার মন খুশি করা চেষ্টা থাকবে কিন্তু চিকিৎসার মেইন কনটেন্ট আলাদা করার মতো মানসিক যে সেটআপ সেভাবে সেটা তৈরি হয়নি। একজন চিকিৎসক যখন চিকিৎসা লেখেন, ব্যক্তি যেই হোক না কেন, তিনি চিকিৎসাপত্রে কোনো পার্থক্য করতে জানেন না। সে জন্য ‘আমার রোগীকে ভালো করে দেখে দিয়েন’ বলতে যা বোঝায়, তাতে চিকিৎসকরা বিব্রত হন।

কারণ, সব চিকিৎসকই তার সর্বোচ্চ কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে একজন রোগী দেখেন। চিকিৎসকের দক্ষতাকেন্দ্রিক ও রোগীর মানসিক প্রশান্তি আনয়নকেন্দ্রিক ভিন্নতা থাকতে পারে। ওপরের দুটি আলোচনাই আমার-আপনার চারপাশে খুবই প্রাসঙ্গিক। অথচ এখানে চিকিৎসক বা রোগী কারো দায় নেই। দোষ নেই। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা আমাদের চিন্তায় ও সমাজের শ্রেণিভেদে।

আমাদের একগুচ্ছ মানুষ আছেন, যাদের অর্থের প্রবাহ বেশ ভালো। তাদের ধৈর্য কম থাকে। অর্থের মাপকাঠিতে সবকিছু যাচাই করে ফেলতে চান আর তুলনা করতে থাকেন। দেশের সঙ্গে বিদেশের, শহরের সঙ্গে গ্রামের, করপোরেটের সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের। এখানেই সমস্যা। তুলনা করতে হয় সমানে সমান। এই মানুষ কল্পনাবিলাসী হন। তারা কোনো কিছুতেই ইতিবাচক কিছু খুঁজতে চান না।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূলনীতি (Ethics) অনুযায়ী যদি সরল ভাষায় বলি, ওপরের দুটিই ভিত্তিহীন প্রসঙ্গ। যত ধরনের টেস্টই দেওয়া হোক না কেন, তা অপ্রয়োজনীয় নয়। টেস্টের মানে পার্থক্য থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে যত্রতত্র গড়ে ওঠা নামহীন বৈধ লাইসেন্সহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হবে। এটি সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকের সামান্য সময়ের কাজ। পাশাপাশি কোয়ালিটি টাইম মেইন্টেইন করতে চিকিৎসাকে জাতীয়করণ করতে হবে। বিভিন্ন সেবার জাতীয়করণবিষয়ক আলোচনা অন্য একদিন আরেকটি লেখায় আলোচনা করার চেষ্টা করব। আজ চিকিৎসাবিষয়ক ব্যাপারটিতেই মনোনিবেশ করছি।

শেষ কথা, একটা পরীসংখ্যানে দেখেছিলাম আমাদের দেশে স্বাধীনতার আগে কোটিপতি জনসংখ্যা ছিল মাত্র চারজন। স্বাধীনতার পর তা প্রথমে কমে, পরে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ১৯৮০ সালে এ সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১৮ জনে। বর্তমানে তা হয়তো কয়েক লাখে পরিণত হয়ে থাকতে পারে, এর মধ্যে হাজার কোটি টাকার ওপরে আছে, এমন সংখ্যাও নেহাত কম নন।

যেহেতু আমাদের দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা খুবই সীমিত। তাই চিকিৎসা পেশাটাকে জাতীয়করণ করে এবং মোট জনসংখ্যার সবাইকে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবীমার আওতায় এনে চিকিৎসাসেবা দিলে আমাদের সবার মনে স্বস্তি মিলত। আমাদের দেশের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে সেবার যে ঘাটতি আছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তা পূরণ করে মানুষের সব চিকিৎসাসেবা এই দেশের বুকেই সম্ভব। এত কিছু করেও হয়তো বিদেশমুখিতা ফেরানো সম্ভব নয়।

কেননা, বিভিন্ন দেশের রোগীদের বিদেশমুখিতা নিয়ে আমি ডেটা সংগ্রহ করে দেখেছি, অস্ট্রেলিয়ার রোগী উন্নত চিকিৎসা নিতে আমেরিকা যায় আর আমেরিকার রোগী অস্ট্রেলিয়ায়। একইভাবে সিঙ্গাপুরের রোগীও আমেরিকা/ইউরোপে যাচ্ছে। পাক-ভারতীয় রোগীরা যায় সিঙ্গাপুরে। বলা বাহুল্য, তারা উন্নত চিকিৎসা দেন ঠিকই, তবে যে খরচে যা পাওয়া যায়, তারও অনেক কম খরচে এই দেশে আরো বেশি কিছু দেওয়া যেত সম্ভবত।

লেখক : ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

গর্ভবতী নারীরা নিরাপদে রোজা রাখবেন যেভাবে

ইফতারের পর ক্লান্তি দূর করতে যা করবেন

‘মানুষকে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে হবে না, ডাক্তার মানুষের পেছনে ঘুরবে’

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?

রোজায় নাক-কান গলার চিকিৎসা

খাদ্য ওষুধের কাজ করে?

বসন্তে ছড়িয়ে পড়া রোগ

বিষণ্ণতায় ওষুধের চেয়েও কার্যকর হতে পারে নাচ

আয়ুর্বেদিকের কোন ওষুধ ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়

জেনে নিন পিঠের ব্যথা এড়ানোর সঠিক উপায়