আপনার ছোট্ট শিশুটিকে যখন কোলের কাছে টেনে নেন, তখন কি আপনি ভাবতে পারেন যে তার এমন কোনো রোগ হতে পারে, যা তার নিষ্পাপ শরীরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে? যে রোগটি একসময় মানুষের মনে ভীতির জন্ম দিয়েছিল, আজও আমাদের সমাজে সেই যক্ষ্মা বা টিবির ছাপ বিদ্যমান। তবে একটি সুখবর আছে! চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এই রোগ এখন পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য।
যক্ষ্মা কী এবং কেন তা এত ভয়ের?
‘যক্ষ্মা’ একটি ভয়ানক শব্দ, যা অজান্তেই বুকের মধ্যে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। একসময় প্রচলিত কথা ছিল—‘যার হয় যক্ষ্মা, তার নেই রক্ষা।’ তবে এখন এটি মোটেও সত্য নয়। এটি একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। অনেকেই ভাবেন, এটি কেবল ফুসফুসেই হয়। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই রোগ আপনার শিশুর মস্তিষ্ক, হাড়, পেট, কিংবা রক্তের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে!
কীভাবে শিশুরা যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়?
আমাদের ঘরে কিংবা আশেপাশেই লুকিয়ে আছে এই রোগের জীবাণু। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য যদি ফুসফুসের যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন, তার হাঁচি বা কাশির সঙ্গে বাতাসে ছড়ায় রোগের জীবাণু। শিশুর কোমল ফুসফুসে সেই জীবাণু শ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করে। সে আপনার সন্তানকে ভালোবেসে ছুঁয়ে দিলে, একসঙ্গে খেলে বা একই বিছানায় শুলে রোগটি ছড়াবে না। আপনার স্নেহ তাকে সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু সচেতনতা সবসময় দরকারি।
শিশুর যক্ষ্মার লক্ষণগুলো কীভাবে বুঝবেন?
আপনার শিশুটি কি আগের মতো হাসছে না, খেলছে না, কিংবা খেতে চাচ্ছে না?
এক্ষেত্রে যদি তার দুই সপ্তাহের বেশি জ্বর থাকে, কাশি ভালো না হয়, ওজন কমতে থাকে, সবসময় ক্লান্ত লাগে, অথবা কফে রক্ত দেখা দেয়, তা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। বিশেষ করে যদি তার ঘাড়ে বা বগলে ব্যথাহীন গুটি হয়, পেটে চাকা দেখা যায় বা মাথাব্যথার সঙ্গে খিঁচুনি হয়, তা হলে এটি ফুসফুসের বাইরের যক্ষ্মার লক্ষণ হতে পারে। আপনার সন্তানের জন্য কী করবেন? প্রথমেই মনে রাখবেন, যক্ষ্মা কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটি একটি সংক্রমণ এবং সঠিক চিকিৎসা পেলে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।
আপনার করণীয়
১. বিসিজি টিকা : জন্মের পরপরই শিশুকে বিসিজি টিকা দিন। এটি ফুসফুসকে যক্ষ্মার জটিলতা থেকে রক্ষা করে।
২. পর্যাপ্ত আলো-বাতাস : ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও আলোকিত রাখুন।
৩. রোগীকে আলাদা রাখুন : পরিবারের কেউ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে তার দ্রুত চিকিৎসা করান।
চিকিৎসার কথা
আপনার সন্তান যদি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়, তবে চিন্তা করবেন না। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে রোগটি সেরে যায়। DOTS পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে ওষুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। শিশুর ওজন অনুযায়ী ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা হয় এবং সাধারণত ছয় মাস ধরে এই চিকিৎসা চলে। কিন্তু মস্তিষ্ক বা হাড়ে সংক্রমণ হলে ১২ মাসও লাগতে পারে। কখনো কখনো স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধও ব্যবহার করতে হয়।
ফলোআপ কতটা জরুরি?
মনে রাখবেন, যক্ষ্মার চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করলে রোগ আরো ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রতিমাসে চিকিৎসকের কাছে যান, ওজন মাপুন এবং লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করুন। ওষধের কোর্স শেষ করার আগে কখনোই তা বন্ধ করবেন না।
শিশুর যক্ষ্মা প্রতিরোধে সহজ কিছু উপায়
আমাদের সন্তানেরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। যে যক্ষ্মা একসময় ভয়ের নাম ছিল, আজ তা নিরাময়যোগ্য। সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা ও ভালোবাসা দিয়ে আমরা আমাদের সন্তানকে রক্ষা করতে পারি। আসুন, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে যক্ষ্মামুক্ত একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলি।’ একজন শিশুর হাসি সবচেয়ে আনন্দদায়ক অনুভূতির একটি। কোনো রোগ যাতে সেই হাসি কেড়ে নিতে না পারে, এটা আমাদের নিয়ত প্রত্যাশা।
লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ
বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, ফেনী