পেশিবহুল ও শক্তিশালী শরীরের অধিকারী হয়েও কিছু বডিবিল্ডার অল্প বয়সে মারা যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি আকস্মিক মৃত্যু আবারও প্রশ্ন তুলেছে, এর পেছনে আসলে কী কারণ রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাহিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি জিমে নিজের ছবি পোস্ট করেছিলেন মেইলসন আরাউজো। নিয়মিতই এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিতেন তিনি।
ছবিতে তার বিশাল পেশিবহুল শরীর দেখা যাচ্ছিল। লাল রঙের ভেস্ট পরা আরাউজোর বাহুর পেশি তাকে অনেকটা সুপারহিরোর মতো দেখাচ্ছিল। পেশাদার বডিবিল্ডার হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবেও তার হাজার হাজার অনুসারী ছিলেন।
ছবি পোস্ট করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিজের বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন ৩৫ বছর বয়সি আরাউজো। পরে তার মৃত্যু হয়।
আরাউজোর মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে অল্প বয়সে আকস্মিক মৃত্যুর শিকার হওয়া বডিবিল্ডারদের তালিকায় তার নাম যুক্ত হয়েছে।
গত মে মাসের শেষ দিকে ব্রাজিলের পরিচিত তরুণ বডিবিল্ডার গ্যাব্রিয়েল গানলি ২২ বছর বয়সে আকস্মিক হৃদ্রোগজনিত কারণে মারা যান। এর আগের বছর ৩০ ও ৪০ বছর বয়সি আরো দুই ব্রাজিলিয়ান বডিবিল্ডার হৃদ্যন্ত্র-সংক্রান্ত সমস্যায় মারা যান। তাদের একজন প্রতিযোগিতা চলাকালীন মারা গিয়েছিলেন।
শুধু ব্রাজিল নয়, বিশ্বের অন্য দেশেও এমন ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বডিবিল্ডার ডালাস ম্যাককারভার ২০১৭ সালে ২৬ বছর বয়সে মারা যান। জার্মান ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার ও বডিবিল্ডার জো লিন্ডনার ২০২৩ সালে মারা যান ৩০ বছর বয়সে।
ঝুঁকি কতটা
তাহলে দেখতে শক্তিশালী ও সুস্থ মনে হওয়া কিছু বডিবিল্ডার কেন অল্প বয়সে হঠাৎ মারা যাচ্ছেন?
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় প্রতিযোগিতামূলক বডিবিল্ডিংয়ের কিছু ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকেরা ২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে খেলাটির নিয়ন্ত্রক সংস্থার আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রায় ২০ হাজার অপেশাদার ও পেশাদার বডিবিল্ডারকে অনুসরণ করেন।
‘ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নাল’-এ প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, অপেশাদার প্রতিযোগীদের তুলনায় পেশাদার বডিবিল্ডারদের আকস্মিক হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি পাঁচ গুণেরও বেশি।
আকস্মিক হৃদ্রোগজনিত মৃত্যু বলতে হৃদ্যন্ত্রের হঠাৎ স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়াকে বোঝায়। তরুণ ও সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের মৃত্যু বিরল। সাধারণত এর সঙ্গে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির কোনো অন্তর্নিহিত রোগের সম্পর্ক থাকে।
গবেষণায় মোট ১২১টি মৃত্যু শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪৬টিকে আকস্মিক হৃদ্রোগজনিত মৃত্যু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। মৃত্যুর সময় তাদের গড় বয়স ছিল ৪৫ বছর। তবে সক্রিয়ভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে গড় বয়স ছিল মাত্র ৩৪ দশমিক ৭ বছর।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ইতালির ইউনিভার্সিটি অব পদুয়ার ড. মার্কো ভেকিয়াতোর মতে, বডিবিল্ডারদের মৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধের ব্যাপক ব্যবহার, প্রতিযোগিতার আগে দ্রুত ওজন কমানো এবং চরম শক্তি-নির্ভর প্রশিক্ষণ।
স্টেরয়েডের ভূমিকা
২০২৫ সালে ‘সার্কুলেশন’ সাময়িকীতে ডেনমার্কের গবেষকদের আরেকটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। এতে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহারকারী হিসেবে পরিচিত ১ হাজার ১৮৯ জন পুরুষকে ১১ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের সঙ্গে সাধারণ প্রায় ৬০ হাজার পুরুষের তুলনা করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, স্টেরয়েড ব্যবহারকারীদের কার্ডিওমায়োপ্যাথি হওয়ার ঝুঁকি প্রায় নয় গুণ বেশি। এই রোগে হৃদ্পেশি দুর্বল হয়ে যায়।
স্টেরয়েড ব্যবহারকারীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ছিল তিন গুণ বেশি। হৃদ্যন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকিও ছিল তিন গুণের বেশি।
অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের আরো কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া এবং ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের মতো সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া এসব ওষুধ রক্তচাপ বাড়াতে পারে, ধমনিতে প্লাক জমার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে পারে এবং হৃদ্যন্ত্রের গঠন বদলে দিতে পারে।
‘ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নাল’-এ প্রকাশিত গবেষণায় মৃত বডিবিল্ডারদের ময়নাতদন্তের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়।
অনেকের হৃদ্যন্ত্র অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের বাম নিলয়ের পেশিও পুরু হয়ে গিয়েছিল। হৃদ্যন্ত্রের এই প্রধান পাম্পিং প্রকোষ্ঠের দেয়াল পুরু হলে অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন ও হৃদ্যন্ত্র বিকলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে টক্সিকোলজিক্যাল বিশ্লেষণ এবং প্রকাশ্যে পাওয়া প্রতিবেদনে অ্যানাবলিক ওষুধের অপব্যবহারের তথ্যও পাওয়া যায়। এসব ওষুধ মেদহীন পেশি তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে ময়নাতদন্তে সাধারণত এগুলোর পরীক্ষা করা হয় না।
অল্প বয়সে মারা যাওয়া বডিবিল্ডারদের ময়নাতদন্তে প্রায়ই বড় হৃদ্যন্ত্রের লক্ষণ পাওয়া গেছে।
এর আলোচিত উদাহরণ ডালাস ম্যাককারভার। ২০১৭ সালে ২৬ বছর বয়সে মারা যান তিনি। ময়নাতদন্তে দেখা যায়, তার হৃদ্যন্ত্রের ওজন ছিল ৮৩৩ গ্রাম। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের প্রত্যাশিত হৃদ্যন্ত্রের ওজনের তুলনায় এটি দ্বিগুণেরও বেশি।
২০২২ সালের একটি পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের বডিবিল্ডারদের ময়নাতদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, তাদের হৃদ্যন্ত্রের ওজন গড়ে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি ছিল। বাম নিলয়ের দেয়ালও প্রত্যাশিত মাত্রার তুলনায় ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি পুরু ছিল।
ইতালি ও স্পেনের ফরেনসিক প্রতিবেদন নিয়েও আলাদা একটি গবেষণা করা হয়। সেখানে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহারকারী বডিবিল্ডারদের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, ২০-এর কোটায় থাকা তরুণ অ্যাথলেটদের হৃদ্যন্ত্র বড় হয়ে গেছে। হৃদ্পেশি গুরুতরভাবে পুরু হয়ে গেছে। কারো কারো করোনারি ধমনি রোগও অগ্রসর অবস্থায় ছিল।
২৪ বছর বয়সি এক বডিবিল্ডারের প্রধান করোনারি ধমনিগুলোতে ৭৫ শতাংশের বেশি প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়। তার পরিবারে হৃদ্রোগের কোনো পরিচিত ইতিহাসও ছিল না।
হৃদ্যন্ত্রও একটি পেশি
এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট ও খেলোয়াড়দের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ক্লেটন মাচেদো বলেন, ‘হৃদ্যন্ত্রও অন্য যেকোনো পেশির মতোই একটি পেশি।’
তিনি বলেন, কোনো রোগীর বাইসেপ দেখেও তিনি তার হৃদ্যন্ত্রের আকার সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। কারণ শরীরের অন্যান্য পেশির সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রও বড় হয়।
স্টেরয়েড ছাড়া ওজনভিত্তিক অনুশীলন করলে হৃদ্যন্ত্র বড় হতে পারে। এটি শরীরের স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর অভিযোজনের অংশ।
তবে ব্রাজিলিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজির বাহিয়া শাখার সভাপতি লুইজ এদুয়ার্দো ফন্তেলেস রিত বলেন, স্টেরয়েডের সঙ্গে তীব্র ওজন প্রশিক্ষণ যুক্ত হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
তার মতে, এ ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্র শুধু বড়ই হয় না, সঠিকভাবে সংকুচিত হওয়ার সক্ষমতাও হারাতে শুরু করতে পারে।
রিত বলেন, ‘এটি ধীরে ধীরে হৃদ্যন্ত্র বিকলের দিকে যেতে পারে এবং একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়।’
তবে সব ক্ষেত্রে হৃদ্পেশি পুরু হওয়ার কারণ স্টেরয়েড নয়। বংশগত সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।
রিত বলেন, ‘এখানে একটি ধূসর অঞ্চল রয়েছে। এটি জিনগতভাবে নির্ধারিত হৃদ্রোগ হতে পারে। এটি অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এটি প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অথবা তিনটিরই সমন্বয় হতে পারে।’
‘অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহারের কোনো নিরাপদ উপায় নেই’
সাবেক বডিবিল্ডার রদ্রিগো গোয়েস জানান, ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি স্বাভাবিকভাবে প্রতিযোগিতা করেছেন। এরপর চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে স্টেরয়েড ‘সাইকেল’ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
‘সাইক্লিং’ বলতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ ধরে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড গ্রহণ করা এবং পরে শরীরকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে তা বন্ধ রাখাকে বোঝায়।
গোয়েস বলেন, ‘শরীরে এর প্রভাব অবিশ্বাস্য।’
তিনি বলেন, স্বাভাবিক পদ্ধতির তুলনায় অনেক দ্রুত পেশি তৈরি করা যায়। শরীর আরো ছিপছিপে হয় এবং পেশি দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়। এ কারণেই স্টেরয়েড এত আকর্ষণীয়।
তবে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সতর্ক মাত্রায় ব্যবহার করার পরও তার চুল পড়া, মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং তীব্র রাতের ঘামের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় বলে জানান গোয়েস।
তার মতে, সবচেয়ে খারাপ প্রভাব ছিল মানসিক।
তিনি বলেন, ‘ইনজেকশনের পুরো প্রক্রিয়াটির মধ্যে আমি কখনো স্বস্তি বোধ করিনি। এক অর্থে আমার মনে হতো আমি যেন মাদকাসক্ত।’
‘এ কথা বলা কঠিন, কিন্তু আমার মনে হতো আমি ভুল কিছু করছি।’
গোয়েস এখন স্টেরয়েড অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান।
তিনি বলেন, ‘অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহারের কোনো নিরাপদ উপায় নেই। চিকিৎসকেরা যা করতে পারেন তা হলো ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা, কিন্তু ক্ষতি হবেই।’
‘আমি কারো বাইসেপ দেখেই বুঝতে পারি’
স্টেরয়েডের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি পরিমাপের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো, অনেক দেশেই স্টেরয়েড-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।
ব্রাজিলে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
অন্যান্য অনেক দেশেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ব্যবহারের ভূমিকা নিয়মিতভাবে নথিভুক্ত করা হয় না।
সাধারণত মৃত্যুকে তাৎক্ষণিক কারণ অনুযায়ী শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। যেমন—হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা কার্ডিওমায়োপ্যাথি। সেখানে কর্মক্ষমতা-বর্ধক ওষুধের সম্ভাব্য ভূমিকা বিবেচনায় আসে না।
মেডিক্যাল পরীক্ষকদের মতে, অ্যানাবলিক স্টেরয়েড শরীরে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হরমোনের সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ। ফলে মৃত্যুর পর এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয় এবং অনেক সময় ধরা পড়ে না।
এ কারণে কর্মক্ষমতা-বর্ধক ওষুধের সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে কত মৃত্যু জড়িত, তা নির্ধারণ করা কঠিন।
মাচেদো বলেন, ‘আমি প্রতিদিনই এসব নিয়ে কাজ করি।’
তিনি বলেন, ‘আমি কারো বাইসেপ দেখেই বুঝতে পারি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যখন আমি সেই বাইসেপ দেখি, তখন প্রায়ই বুঝতে পারি যে ওই ব্যক্তির হৃদ্যন্ত্র ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে।’
‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর মূল্য পরে গুনতে হয়।’
এএম