গোপনাঙ্গে আকার নিয়ে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থেকে অনেক পুরুষ এখন ফিলার নেওয়ার দিকে ঝুঁকছেন। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের প্রসাধনমূলক চিকিৎসার চাহিদা বাড়ছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। তবে এর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং ভুলভাবে করা হলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে।
জেসন এমনই একজন। তিনি গোপনাঙ্গের দৈর্ঘ্য নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। তবে তার মনে হয়েছিল, পরিধি আরো কিছুটা বাড়লে গঠনটি ভারসাম্যপূর্ণ দেখাবে। তাই প্রায় এক বছর বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনার পর তিনি অস্ত্রোপচারের বদলে সাময়িক ফিলার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
হায়ালুরোনিক অ্যাসিডের ফিলার নেওয়ার পর তার পুরুষাঙ্গের পরিধি ১৬ শতাংশ বেড়েছে। তিনি ও তার সঙ্গী দুজনই এতে সন্তুষ্ট। জেসনের ভাষায়, এতে তার ‘আত্মবিশ্বাস বেড়েছে’।
তিনি বলেন, ‘সবকিছু এখনো স্বাভাবিকভাবেই কাজ করে। শুধু ওই সামান্য বাড়তি প্রস্থটা এসেছে।’
তবে তিনি অতিরিক্ত বড় আকার চাননি। ‘কোক ক্যান’ নামে পরিচিত অতিরিক্ত ফিলার দিয়ে অস্বাভাবিক বড় করা পুরুষাঙ্গের প্রসঙ্গ টেনে জেসন বলেন, ‘কিছু মানুষ সত্যিই খুব বাড়াবাড়ি করে ফেলেন।’
কেন ফিলার নিচ্ছেন পুরুষেরা
জেসন মনে করেন, তার সিদ্ধান্তের পেছনে দম্ভ বা অতিপুরুষালি মানসিকতা কাজ করেনি। তিনি এমন ধারণাতেও বিশ্বাস করেন না যে পুরুষাঙ্গ যত বড়, পুরুষ তত বড়।
বরং তার মতে, পুরুষদের চেহারা ও শরীর নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশা বদলে গেছে।
তিনি বলেন, ‘শুধু নারীদেরই নয়, পুরুষদেরও এখন তাল মিলিয়ে চলতে হয়।’
জেসনের ভাষায়, ‘সমাজই বদলাচ্ছে। আমার মনে হয়, গণমাধ্যম যেভাবে সবকিছু তুলে ধরে, তা এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলে। এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আপনি নিখুঁত চেহারার কারও ছবি না দেখেই যেতে পারেন।’
পুরুষাঙ্গ বড় করার সেবা দেওয়া বিভিন্ন ক্লিনিকের ওয়েবসাইটেও পুরুষদের অনিরাপত্তাবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি কি আপনার পুরুষাঙ্গের আকার নিয়ে বিব্রত?’
পুরুষাঙ্গের আকার বা গঠন পরিবর্তনের জন্য অস্ত্রোপচার ও অস্ত্রোপচারবিহীন—দুই ধরনের পদ্ধতিই রয়েছে। পুরুষাঙ্গে বিভিন্ন উপাদান ইনজেকশন দেওয়ার পদ্ধতিও আছে।
সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর একটি হলো হায়ালুরোনিক অ্যাসিডের জেলজাতীয় ফিলার। ঠোঁটের ফিলারেও এই উপাদান ব্যবহার করা হয়।
হায়ালুরোনিক অ্যাসিড শরীরে স্বাভাবিকভাবেই থাকা একটি শর্করা অণু। এটি পানি আকর্ষণ করে ধরে রাখতে পারে। এ কারণে একে ‘আর্দ্রতার চুম্বক’ও বলা হয়।
ছয় থেকে নয় মাস স্থায়ী হতে পারে
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রেস্টউইচে নিজের ক্লিনিকে এক বছরের বেশি সময় ধরে পুরুষাঙ্গে ফিলার দিয়ে আসছেন চিকিৎসক জাভেদ হুসেইন। চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি কসমেটিক চিকিৎসার দিকে আসেন।
তার দাবি, এ ধরনের চিকিৎসার চাহিদা বাড়ছে। তিনি বিভিন্ন বয়সি পুরুষের চিকিৎসা করেছেন। তার সবচেয়ে কম বয়সি রোগীদের কেউ কেউ ২০-এর মাঝামাঝি বয়সের। সবচেয়ে বেশি বয়সি রোগীর বয়স ৭২ বছর।
প্রক্রিয়ার আগে রোগীর স্বাস্থ্য, কেন তিনি এই চিকিৎসা নিতে চান, তার প্রত্যাশা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
নির্ধারিত দিনে পুরুষাঙ্গের তিনটি স্থানে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড দেওয়া হয়। একটি অংশে ওপরের দিকে এবং দুটি দুই পাশে। ক্যানুলার মাধ্যমে ফিলার প্রবেশ করানো হয়। এটি গোড়া দিয়ে ঢুকিয়ে পুরুষাঙ্গের শ্যাফটের পুরো দৈর্ঘ্য বরাবর এগিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর ফিলার সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে জায়গাটি ম্যাসাজ করা হয়। বাড়িতেও রোগীকে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হয়।
এতে খরচ হতে পারে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পাউন্ড। এক পাউন্ড ১৬৬ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ ৫ লাখ ৮১ হাজার টাকার বেশি।
হুসেইনের মতে, এই পদ্ধতিতে ছয় থেকে নয় মাসের জন্য পুরুষাঙ্গের পরিধি ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে এর ঝুঁকিও রয়েছে। ব্যথা, কালশিটে দাগ এবং ফিলার অসমভাবে ছড়িয়ে পড়ার মতো তুলনামূলক কম গুরুতর সমস্যা হতে পারে। আবার সংক্রমণের মতো গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
ফিলার ব্যবহার করা এ ধরনের সব প্রক্রিয়াতেই এসব ঝুঁকি রয়েছে। এর বাইরে পুরুষাঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ গঠন ও রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও আছে। এসব রক্তনালি উত্থানের জন্য প্রয়োজনীয়।
‘পুরুষাঙ্গের কালো হতে শুরু করেছিল’
পুরুষাঙ্গে ফিলার দেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ রয়েছে। তবে হুসেইন বলেন, তিনি এই উদ্বেগ পুরোপুরি বোঝেন।
তিনি বলেন, ‘এই দুশ্চিন্তা যথার্থ কারণ থেকেই আসে। কিন্তু একই সঙ্গে আরো বেশি প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, আমরা ফলাফলও দেখছি’ এবং ‘পুরুষদের জন্য এতে এক ধরনের উপকার রয়েছে।’
হুসেইনের দাবি, কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত ফিলার গলিয়ে দেওয়ার ওষুধসহ তার একটি ‘তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা পরিকল্পনা’ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সৌভাগ্যবশত, আমাদের কখনো এটি ব্যবহার করতে হয়নি।’ তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
তবে অন্য একটি ক্লিনিক থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পর এক রোগী তার কাছে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন বলে জানান হুসেইন।
তার ভাষায়, ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি ‘খুবই খারাপভাবে’ ঘটেছিল।
হুসেইনের দাবি, সেখানে ভুল ধরনের ফিলার ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে ‘পুরুষাঙ্গ কালো হতে শুরু করেছিল’। পদ্ধতিটি রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল এবং ত্বক মারা যাচ্ছিল।
ওই ব্যক্তিকে সরাসরি জরুরি বিভাগে পাঠানো হয়।
ব্যর্থ চিকিৎসার পর ত্বক খসে পড়ার ঘটনা
ম্যানচেস্টারে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) অ্যান্ড্রোলজিস্ট ও পরামর্শক ইউরোলজিক্যাল সার্জন অধ্যাপক বৈভব মোদগিলও এমন রোগী দেখেছেন, যারা পুরুষাঙ্গের আকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘যখন এমনটা ঘটে, তখন রোগীর জন্য তা বিধ্বংসী হতে পারে।’
মোদগিল এমন রোগীর কথাও স্মরণ করেন, যাদের ‘ত্বকের নেক্রোসিস’ হয়েছিল। অর্থাৎ ত্বকের কোনো অংশ মারা গিয়ে কালো হয়ে যায়। পরে সেই ত্বক খসে পড়তে শুরু করে।
তিনি বলেন, ‘পুরুষেরা হয়তো ভাবেন—“দারুণ হবে”, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আগের চেয়েও বেশি অসন্তুষ্ট হয়ে যেতে পারেন।’
নিজের প্রকৃত নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া অ্যালেক্স ভিন্ন ধরনের লিঙ্গবর্ধক চিকিৎসার জন্য জার্মানিতে গিয়েছিলেন।
তিনি এমন অস্ত্রোপচার করান, যাতে লিঙ্গকে জননাঙ্গের হাড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখা লিগামেন্ট কেটে দেওয়া হয়। এতে পুরুষাঙ্গকে দেখতে আরো লম্বা লাগে। তার শরীর থেকে চর্বিকোষ সংগ্রহ করে পুরুষাঙ্গেও ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল।
অস্ত্রোপচারের পর ঘুম থেকে উঠে তিনি তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। এতটাই যে দাঁড়াতেও পারছিলেন না।
অ্যালেক্স বলেন, ‘আমার শরীরে প্রচুর কালশিটে পড়েছিল এবং উরুর ওপরের অংশ পুরো হলুদ হয়ে গিয়েছিল। প্রায় এক মাস আমি ঠিকমতো হাঁটতে পারিনি।’
পরে মোদগিলের ক্লিনিকে তার চিকিৎসা হয়। শেষ পর্যন্ত তাকে সুস্থ ঘোষণা করা হয়।
অ্যালেক্স বলেন, ‘অনেক মানুষ সেই সৌভাগ্য পান না। আমি ভাগ্যবান ছিলাম।’
তার মতে, আগে নিজের পুরুষাঙ্গকে তার কাছে কখনো ছোট মনে হয়নি। কিন্তু সমাজ ও পর্নোগ্রাফি তাকে বোঝায় যে বড় পুরুষাঙ্গই ‘পুরুষালি এবং সবচেয়ে ভালো’।
চিকিৎসকেরা কেন সতর্ক করছেন
পুরুষাঙ্গের আকার বড় করার চিকিৎসা নেওয়া পুরুষের সংখ্যা কত, তার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নেই। তবে অনলাইন অনুসন্ধানের প্রবণতা, বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে এ ধরনের চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন মোদগিল।
এ কারণে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনস এ ধরনের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন সুপারিশ প্রকাশ করেছে।
মোদগিল বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি যে নির্দেশিকা তৈরি করেছি, সেখানে মূলত বলা হয়েছে যে এসব প্রক্রিয়ার পক্ষে আমরা সুপারিশ করতে পারি না, কারণ প্রমাণ এতই দুর্বল।’
সংগঠনটি ৩ হাজার ৭৫০ জন পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করা ৩৬টি গবেষণা পর্যালোচনা করেছে। এরপরও তারা বলেছে, এসব প্রক্রিয়ার ‘নিরাপত্তা প্রোফাইল’ এখনো স্পষ্ট নয়।
এর একটি কারণ হলো, দীর্ঘমেয়াদে ফিলার পুরুষাঙ্গে কী প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
আরেকটি উদ্বেগ হলো, ঠোঁটের ফিলারের মতো পুরুষাঙ্গে ফিলার দেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো আনুষ্ঠানিক যোগ্যতার প্রয়োজন নেই।
মোদগিল মনে করেন, এ ধরনের চিকিৎসায় পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ‘সম্ভবত অতিরিক্ত কঠোর’ হবে। তবে চিকিৎসা যদি চলতেই থাকে, তাহলে এ শিল্পখাতের ‘ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন’।
তিনি একটি জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। সেখানে পুরুষাঙ্গে ফিলার দেওয়ার তথ্য নথিভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তার মতে, এতে পুরুষেরা এ ধরনের চিকিৎসার ঝুঁকি ও সম্ভাব্য উপকার সম্পর্কে জেনে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
জেসনের ক্ষেত্রে অবশ্য অভিজ্ঞতাটি ইতিবাচক। বর্তমান ফিলারের প্রভাব শেষ হয়ে গেলে তিনি আবারও এটি করাবেন বলে মনে করেন।
তবে চিকিৎসকদের সতর্কবার্তাও স্পষ্ট—লিঙ্গের আকার নিয়ে অসন্তুষ্টি থেকে নেওয়া একটি প্রসাধনমূলক সিদ্ধান্ত ভুলভাবে করা হলে তা গুরুতর শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এএম