সেমিনারে বক্তারা
দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে অসংক্রামক রোগে (এনসিডি), যার অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ তামাক ব্যবহার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে বিপুলসংখ্যক তরুণ ধূমপান শুরু করছে, যা ভবিষ্যতে হৃদরোগ, ক্যানসার ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের বোঝা আরও বাড়াবে। এ প্রেক্ষাপটে তরুণদের তামাক ব্যবহার শুরু নিরুৎসাহিত করা এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত ‘তরুণদের তামাক ব্যবহার ও অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় এবং প্ল্যাটফর্ম অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটির উদ্যোগে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্ল্যাটফর্ম অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. ইরফানুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির পরিচালক ও মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান ডা. মুনতাহা ফারহান।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন এবং প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ১০ দশমিক ৩ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে সরকার তামাক খাত থেকে রাজস্ব পেয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা।
প্রবন্ধে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে ১০ শলাকার প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ এবং উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম যথাক্রমে ১৫০ টাকা ও ২০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।
সেমিনারে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, অসংক্রামক রোগ বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ।
হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ তামাক। তরুণ বয়সে তামাকের আসক্তি শুরু হলে পরবর্তী জীবনে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই তরুণদের তামাক থেকে দূরে রাখতে আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধি করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রেই লাভজনক। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, মূল্য বৃদ্ধি করলে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয়ও বাড়ে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান জটিল বহুস্তরবিশিষ্ট কর কাঠামোর সংস্কার করা হলে সরকার ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি তামাক কর রাজস্ব পেতে পারে, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেশি।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মো. আখতারউজ-জামান বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত তামাক নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করছে। ইতোমধ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে তামাকপণ্যের কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তামাকপণ্যের দাম বাড়লে বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের প্রবণতা কমে আসে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে হবিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন বলেন, তামাকজনিত রোগের বোঝা কমাতে কার্যকর তামাক কর ও মূল্য বৃদ্ধি জরুরি। নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য কমপক্ষে ১০০ টাকা নির্ধারণ করা উচিত। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে সিগারেটের সহজলভ্যতা কমবে, তরুণদের ধূমপান শুরু নিরুৎসাহিত হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
সভাপতির বক্তব্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, তরুণদের সুরক্ষায় কার্যকর তামাক করনীতি জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর কর বৃদ্ধি করলে একদিকে তামাক ব্যবহার কমবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
সেমিনারে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সমন্বয়ক ডা. অরুনা সরকার।