সকালে ঘুম থেকে উঠে মেথি ভেজানো পানি পান করার অভ্যাস রয়েছে অনেকের। লোকজ চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে মেথির ব্যবহার প্রচলিত। এতে ফাইবার, প্রোটিন, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে। তবে মেথি ভেজানো পানি কোনো জাদুকরী পানীয় নয়। খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এটি কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, আবার অতিরিক্ত গ্রহণে অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে
মেথিতে থাকা দ্রবণীয় ফাইবার হজম ও কার্বোহাইড্রেট শোষণের গতি ধীর করতে পারে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটি কিছুটা সহায়ক হতে পারে। কিছু গবেষণায় মেথি গ্রহণের সঙ্গে রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প হিসেবে মেথি পানি ব্যবহার করা উচিত নয়। নিয়মিত ওষুধ গ্রহণকারীদের মেথি নিয়মিত খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে
মেথির ফাইবার পানি শোষণ করে কিছুটা ফুলে ওঠে। এতে খাবারের পর দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা অনুভূতি থাকতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণের খাদ্যতালিকায় মেথি রাখা যেতে পারে। তবে শুধু মেথি পানি পান করলেই দ্রুত ওজন কমবে—এমন দাবির যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ওজন নিয়ন্ত্রণে সুষম খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামই গুরুত্বপূর্ণ।
হজমে সহায়ক হতে পারে
মেথির ফাইবার হজমপ্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে এবং পর্যাপ্ত পানি ও সুষম খাবারের সঙ্গে এটি গ্রহণ করলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মেথি পানি খালি পেটে পান করলেই বুকজ্বালা, গ্যাস বা অম্লতা দূর হবে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বরং কারও কারও ক্ষেত্রে বেশি মেথি খেলে পেটের অস্বস্তি হতে পারে। তাই অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করা ভালো।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে
মেথি নিয়ে পরিচালিত কিছু গবেষণায় মোট কোলেস্টেরল, এলডিএল কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমার সম্ভাবনা দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে মেথির দ্রবণীয় ফাইবার ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মেথি পানি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর চিকিৎসা নয়।
‘ডিটক্স’ দাবিতে সতর্কতা
মেথি পানি লিভার ও কিডনি থেকে টক্সিন বের করে রক্ত ‘বিশুদ্ধ’ করে—এমন প্রচলিত দাবি রয়েছে। তবে শরীর থেকে বর্জ্য অপসারণের কাজ স্বাভাবিকভাবেই লিভার ও কিডনি করে থাকে। মেথি পানিকে বিশেষ কোনো ‘ডিটক্স’ পানীয় হিসেবে বিবেচনা করার মতো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
যেভাবে তৈরি করবেন
রাতে এক গ্লাস পরিষ্কার পানিতে এক থেকে দুই চা-চামচ মেথি ভিজিয়ে রাখা যায়। সকালে পানি ছেঁকে পান করা যেতে পারে। চাইলে ভেজানো মেথিও অল্প পরিমাণে খাওয়া যায়। ব্যবহারের আগে মেথি ভালোভাবে পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। মেথি পানি খালি পেটেই পান করতে হবে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই। খালি পেটে অস্বস্তি হলে খাবারের পর বা অন্য সময়েও এটি গ্রহণ করা যেতে পারে।
সবার জন্য উপযোগী নয়
গর্ভাবস্থায় বেশি পরিমাণ মেথি গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যারা ডায়াবেটিসের ওষুধ, রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা নিয়মিত অন্য কোনো ওষুধ সেবন করেন, তাদেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ মেথি রক্তে শর্করা কমাতে পারে এবং কিছু ওষুধের সঙ্গে পারস্পরিক প্রভাব তৈরি করতে পারে। মেথিতে অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলেও সাবধানতা জরুরি।
সব মিলিয়ে, মেথি ভেজানো পানি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি ছোট অংশ হতে পারে। তবে কোনো রোগ সারানো বা নিয়ন্ত্রণের জন্য এর ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। পর্যাপ্ত পানি পান, শাকসবজি ও ফল খাওয়া, সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ—সুস্থ থাকার জন্য এসব অভ্যাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এসআর