মাত্র দুই সেকেন্ডেরও কম সময়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। চিকিৎসকেরা এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা সাধারণ ইসিজি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে মানুষের চোখে ধরা না পড়া তথ্য বের করতে পারে।
এই প্রযুক্তি হার্ট ফেইলিউর ও হৃদ্যন্ত্রের ভালভের রোগের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারে। ফলে ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের দ্রুত চিহ্নিত করে ইকোকার্ডিওগ্রামের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
কয়েক মিলিয়ন ইসিজির তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত এই এআই প্রযুক্তির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজির বার্ষিক সম্মেলনে। জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারো চিকিৎসক ও গবেষক অংশ নিয়েছেন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় হৃদ্রোগবিষয়ক সম্মেলন।
ইসিজিতে এবার ধরা পড়বে বাড়তি তথ্য
ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম বা ইসিজি হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম রেকর্ড করে। এতে হৃদ্যন্ত্রের গতি ও ছন্দ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। হার্ট অ্যাটাক ও অস্বাভাবিক হৃদ্স্পন্দন শনাক্ত করতে প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই পরীক্ষা ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে প্রচলিত ইসিজিতে হার্ট ফেইলিউর বা হৃদ্যন্ত্রের ভালভের রোগ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায় না। এসব রোগ নির্ণয়ে সাধারণত ইকোকার্ডিওগ্রাম বা হৃদ্যন্ত্রের আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা প্রয়োজন হয়।
এই পরীক্ষার জন্য রোগীদের অনেক সময় কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়।
নতুন এআই প্রযুক্তি সেই অপেক্ষা কমাতে সহায়তা করতে পারে। ইসিজির ফল বিশ্লেষণ করে এটি খুব দ্রুত এসব রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ শনাক্ত করতে পারে।
৬৭ হাজার রোগীর ওপর পরীক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রে ৬৭ হাজার রোগীর ওপর প্রযুক্তিটির পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, হার্ট ফেইলিউরে আক্রান্ত রোগীদের সর্বোচ্চ ৮১ শতাংশ শনাক্ত করতে পেরেছে এআইটি। হৃদ্যন্ত্রের ভালভের রোগের ক্ষেত্রে শনাক্তের হার ছিল সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ।
তবে এআইটি একাই কোনো রোগের চূড়ান্ত নির্ণয় করতে পারে না। কারো এসব রোগ নেই—এ কথাও নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না।
বরং কারো রোগ থাকার সম্ভাবনা বেশি কি না, সে বিষয়ে শক্তিশালী ইঙ্গিত দিতে পারে।
ঝুঁকি বেশি মনে হলে ওই রোগীকে দ্রুত ইকোকার্ডিওগ্রামের জন্য পাঠানো সম্ভব হবে। এতে দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা এড়িয়ে দ্রুত পরীক্ষা করা যেতে পারে।
ফলে রোগ নির্ণয় দ্রুত হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও আগে শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
‘আগে শনাক্ত হলে জীবন বাঁচে’
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের (বিএইচএফ) অর্থায়নে গবেষণাটি হয়েছে। সংস্থাটির পরামর্শক হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল পরিচালক সোনিয়া বাবু-নারায়ণ বলেন, ইসিজি থেকে এআইয়ের এত দ্রুত ফল দিতে পারা ‘উত্তেজনাপূর্ণ’।
তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি হৃদ্রোগে আক্রান্ত সবাইকে শনাক্ত করতে পারবে না। তবে উচ্চঝুঁকির রোগীদের দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য অগ্রাধিকার দিতে এটি সহায়তা করতে পারে।
তার মতে, হৃদ্রোগ দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে জীবন বাঁচানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব।
বছরে প্রায় ১০০ কোটি ইসিজি
প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহের বড় কারণ ইসিজির ব্যাপক ব্যবহার।
বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি ইসিজি পরীক্ষা করা হয়। ফলে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়মিত করা এই পরীক্ষার তথ্য কাজে লাগিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের হৃদ্রোগের ঝুঁকি আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের হৃদ্রোগবিষয়ক অধ্যাপক ফু সিয়ং এনজি বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শে ইকোকার্ডিওগ্রামের জন্য পাঠানোর পর রোগীদের অনেক সময় কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়।
নতুন প্রযুক্তিটি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের শনাক্ত করতে পারলে তাদের দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্ক্যানের জন্য পাঠানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
অন্য পরীক্ষার সময়ও ধরা পড়বে হৃদ্রোগ
এই এআইয়ের আরেকটি সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে কথা বলেছেন অধ্যাপক এনজি।
অনেক সময় হৃদ্রোগের কোনো সন্দেহ না থাকলেও অন্য কারণে রোগীর ইসিজি করা হয়। সেই ইসিজির তথ্যও এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে।
হাসপাতালে করা সব ইসিজি এআই মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা গেলে উচ্চঝুঁকির রোগীদের আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
এতে আগে সন্দেহ না থাকা হার্ট ফেইলিউর ও ভালভের রোগও দ্রুত শনাক্ত হতে পারে।
হাতে বহনযোগ্য এআই ইসিজি
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষক এবং বিএইচএফের ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ফেলো আহমেদ এল-মেদানি এই বিশ্লেষণের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি প্রযুক্তিটিকে ‘সুপারহিউম্যান এআই’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এখন গবেষকদের লক্ষ্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহারের উপযোগী হাতে বহন করা যায়—এমন এআই-নির্ভর ইসিজি যন্ত্র তৈরি করা।
এ ধরনের যন্ত্র তৈরি হলে হাসপাতালের বাইরে বা প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রেও দ্রুত হৃদ্রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
পাঁচ সেকেন্ডের মুখের ভিডিওতে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস
মিউনিখের সম্মেলনে এআইয়ের আরেকটি সম্ভাব্য চিকিৎসা-ব্যবহার নিয়েও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিওর গবেষকেরা জানিয়েছেন, মুখের মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের ভিডিও বিশ্লেষণ করে উচ্চ রক্তচাপ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষকদের মতে, এআইভিত্তিক এই বিশ্লেষণ রোগ নির্ণয় সহজ করতে পারে।
বিশ্বে উচ্চ রক্তচাপ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত লাখো মানুষ জানেন না যে তারা এসব রোগে ভুগছেন।
গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি অজানা রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আনতে সহায়তা করবে।
এএম