২০ অক্টোবর বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস। আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের (আইওএফ) উদ্যোগে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। হাড়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের আগেভাগে শনাক্ত করা এবং হাড় ভাঙার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দিবসটির অন্যতম লক্ষ্য।
হাড়ের ঘনত্ব কমে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ার রোগ অস্টিওপোরোসিস। দীর্ঘদিন ধরে হাড় ক্ষয় হলেও সাধারণত শুরুতে স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। অনেকেই সামান্য আঘাত বা অল্প উচ্চতা থেকে পড়ে হাড় ভাঙার পর জানতে পারেন, তাদের হাড়ের ঘনত্ব কমে গেছে। এ কারণে অস্টিওপোরোসিসকে প্রায়ই ‘নীরব রোগ’ বা ‘নীরব মহামারি’ বলা হয়।
বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২০ কোটি মানুষ অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত । আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি তিন নারীর একজন এবং প্রতি পাঁচ পুরুষের একজন জীবদ্দশায় অস্টিওপোরোসিসজনিত হাড় ভাঙার শিকার হতে পারেন। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ৮৯ লাখের বেশি হাড় ভাঙার ঘটনা এই রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন হিসাবে উঠে এসেছে। অর্থাৎ প্রতি তিন সেকেন্ডে বিশ্বে কোথাও না কোথাও অস্টিওপোরোসিসজনিত হাড় ভাঙার ঘটনা ঘটে।
কেন হাড় ক্ষয় হয়
অস্টিওপোরোসিসের পেছনে বয়স, হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি ও জীবনযাপনের অভ্যাসসহ একাধিক কারণ কাজ করে। সাধারণত বিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মানুষের হাড়ের সর্বোচ্চ ঘনত্ব অর্জিত হয়। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমতে পারে। তবে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখলে বয়সজনিত হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
পুষ্টির ঘাটতি: খাবারে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন না থাকলে হাড়ের গঠন ও পেশির শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভিটামিন ডির ঘাটতি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়। এর গুরুতর ঘাটতিতে অস্টিওম্যালেশিয়া হতে পারে, যাতে হাড় নরম হয়ে যায়।
হরমোনের পরিবর্তন: নারীদের মেনোপজের সময় ও পরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড় ক্ষয়ের গতি বাড়তে পারে।
পেশির দুর্বলতা: বয়সের সঙ্গে পেশির ভর ও শক্তি কমে যাওয়ার অবস্থাকে সারকোপেনিয়া বলা হয়। পেশি দুর্বল হলে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং হাড় ভাঙার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন কর্টিকোস্টেরয়েডজাতীয় কিছু ওষুধ ব্যবহার করলেও হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
হাড় ক্ষয় রোধে যা করবেন
১. ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান
হাড়ের গঠন ও শক্তি বজায় রাখতে ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডাল, সয়াবিন, বাদাম এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন। পেশির শক্তি ধরে রাখতে পর্যাপ্ত প্রোটিনও প্রয়োজন। বয়স ও শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী পুষ্টি নিশ্চিত করুন।
২. ভিটামিন ডির ঘাটতি পূরণ করুন
ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। নিরাপদ উপায়ে সূর্যের আলো গ্রহণ ও পুষ্টিকর খাবারের মাধ্যমে এর চাহিদা পূরণের চেষ্টা করুন। ঘাটতির আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করান। প্রয়োজন হলে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পূরক গ্রহণ করুন।
৩. নিয়মিত ব্যায়াম করুন
হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এবং শরীরের ওজন বহনকারী অন্যান্য ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক। পাশাপাশি পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম ও ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলন করুন। দ্রুত হাঁটা, প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম এবং বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী অন্যান্য ব্যায়াম পেশি শক্তিশালী করতে ও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
৪. ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলুন
ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান হাড়ের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান পরিহার করুন এবং মদ্যপান এড়িয়ে চলুন।
৫. সময়মতো হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করান
মেনোপজের কাছাকাছি বা পরবর্তী বয়সের নারী, পরিবারে হাড় ভাঙার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি এবং অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বেশি—এমন ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপের জন্য ডেক্সা (ডিএক্সএ) স্ক্যান করা হয়। কার পরীক্ষা প্রয়োজন, তা বয়স, উপসর্গ ও অন্যান্য ঝুঁকির ভিত্তিতে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
৬. ঘরের পরিবেশ নিরাপদ রাখুন
বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে বাড়ির পরিবেশ নিরাপদ করা জরুরি। বাথরুমে হাতল বসান, পিচ্ছিল নয় এমন মেঝে ব্যবহার করুন, পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করুন এবং চলাচলের পথে আলগা কার্পেট, বৈদ্যুতিক তার বা হোঁচট খাওয়ার মতো বস্তু সরিয়ে রাখুন।
৭. হাড় ভাঙলে মূল কারণ খুঁজে দেখুন
সামান্য আঘাতে বা অল্প উচ্চতা থেকে পড়ে হাড় ভেঙে গেলে শুধু ভাঙা হাড়ের চিকিৎসা করেই থেমে থাকা উচিত নয়। এর পেছনে অস্টিওপোরোসিস রয়েছে কি না, তা চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করান। এতে ভবিষ্যতে আবার হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
হাড় ক্ষয় রোধে যা করবেন না
১. দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকবেন না
দীর্ঘ সময় শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলে পেশির শক্তি ও ভারসাম্য কমে যেতে পারে। চিকিৎসকের নিষেধ না থাকলে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত চলাফেরা ও ব্যায়াম করুন।
২. পুষ্টির ঘাটতি অবহেলা করবেন না
খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, ভিটামিন ডি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে তা পূরণের ব্যবস্থা নিন। তবে নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডির সম্পূরক গ্রহণ করবেন না; চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করুন।
৩. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না
কর্টিকোস্টেরয়েডজাতীয় কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করবেন না। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের প্রয়োজন হলে হাড়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
৪. শরীরের সতর্কসংকেত উপেক্ষা করবেন না
দীর্ঘস্থায়ী হাড়ের ব্যথা, চেয়ার থেকে উঠতে অসুবিধা কিংবা হাঁটার গতি কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এসব লক্ষণের একাধিক কারণ থাকতে পারে; শুধু লক্ষণ দেখে অস্টিওপোরোসিস নিশ্চিত করা যায় না।
হাড় ভাঙার পর চিকিৎসায় ঘাটতি কেন উদ্বেগের
অস্টিওপোরোসিস মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো হাড় ভাঙার পর রোগের মূল কারণ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য আঘাতে হাড় ভাঙার পর রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা পেলেও তাঁর হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করা হয় না কিংবা অস্টিওপোরোসিসের চিকিৎসা শুরু হয় না। এতে পরবর্তী সময়ে আবার হাড় ভাঙার ঝুঁকি থেকে যায়।
এই ঘাটতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশন ‘ফ্র্যাকচার লিয়াজোঁ সার্ভিসেস’ (এফএলএস) চালুর ওপর গুরুত্ব দেয়। এটি হাসপাতালভিত্তিক একটি সমন্বিত সেবাব্যবস্থা, যার মাধ্যমে হাড় ভাঙার পর রোগীর অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও পরবর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের সামান্য আঘাতে হাড় ভাঙলে অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
হাড় ভাঙলে জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে
অস্টিওপোরোসিসের গুরুতর পরিণতিগুলোর মধ্যে রয়েছে কোমরের হাড় ভাঙা। এ ধরনের আঘাতের পর অনেকের স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার সক্ষমতা আর ফিরে আসে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাবে, কোমরের হাড় ভাঙার পর প্রায় ৪০ শতাংশ রোগী স্বাধীনভাবে হাঁটতে পারেন না এবং প্রায় ২০ শতাংশের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। এসব জটিলতা রোগী ও পরিবারের ওপর শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করে।
তাই হাড়ের পাশাপাশি পেশির শক্তি বজায় রাখা, পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে কোনো একক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞরা হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় আগাম প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসের মূল বার্তা হলো—হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা না করে আগেভাগেই সচেতন হতে হবে। সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা এবং হাড় ভাঙার পর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অস্টিওপোরোসিসজনিত জটিলতা ও পুনরায় হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা পাওয়া যায়।