বয়স ৪০ পার হওয়ার পর শরীরে ধীরে ধীরে নানা পরিবর্তন শুরু হয়। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও শরীরের ভেতরে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস কিংবা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা নীরবে তৈরি হতে পারে। এসব সমস্যার অনেকগুলোরই প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই মধ্যবয়সে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ‘৪০ বছর হলেই প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য একই চারটি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক’¬Ñএমন কোনো সর্বজনীন চিকিৎসা-নির্দেশনা নেই। বয়সের পাশাপাশি পারিবারিক ইতিহাস, ওজন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান, পূর্ববর্তী রোগ ও অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
১. লিপিড প্রোফাইল (রক্তে কোলেস্টেরল ও চর্বির মাত্রা)
কোলেস্টেরল শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। কোষের গঠন ও বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে এর ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ধমনিতে চর্বি জমে প্লাক তৈরি হতে পারে। এতে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। উচ্চ কোলেস্টেরল সাধারণত কোনো স্পষ্ট উপসর্গ সৃষ্টি করে না; রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই এটি শনাক্ত করা যায়। লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষায় সাধারণত মোট কোলেস্টেরল, HDL বা ‘ভালো’ কোলেস্টেরল, LDL এবং ট্রাইগ্লিসারাইডসহ রক্তের বিভিন্ন চর্বির মাত্রা মূল্যায়ন করা হয়। HDL তুলনামূলকভাবে হৃদযন্ত্রের জন্য সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে LDL বেশি থাকলে ধমনিতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান পরিহার কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। কারো ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধও প্রয়োজন হতে পারে।
২. কিডনির কার্যক্ষমতা
কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ অপসারণ, পানি ও লবণের ভারসাম্য রক্ষা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলেও শুরুতে অনেক সময় কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। রক্তে সিরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এই ফলের ভিত্তিতে সাধারণত EGFR (estimated glomerular filtration rate) হিসাব করা হয়, যা কিডনি কতটা ভালোভাবে রক্ত পরিশোধন করছে তার একটি ধারণা দেয়। কিডনি রোগ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণে শুধু রক্তের ক্রিয়েটিনিন নয়, প্রস্রাবে albumin-to-creatinine ratio (ACR)-ও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা বা কিডনি রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে কিডনি পরীক্ষা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে রোগের অগ্রগতি ধীর করার সুযোগ থাকে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কিডনি ফাংশন পরীক্ষা করা উচিত।
৩. দীর্ঘমেয়াদি রক্তে শর্করার হিসাব
ডায়াবেটিস এখন বিশ্বজুড়েই একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে হৃদরোগ, কিডনি রোগ, চোখের সমস্যা এবং স্নায়ুর ক্ষতির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। HbA1c একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে গত কয়েক মাসে একজন ব্যক্তির রক্তে গ্লুকোজের গড় মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। রক্তের গ্লুকোজ হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে glycated haemoglobin তৈরি করে, HbA1c পরীক্ষায় সেটিই পরিমাপ করা হয়। এটি শুধু পরিচিত ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ পর্যবেক্ষণেই নয়, উপযুক্ত পরিস্থিতিতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস শনাক্ত করতেও ব্যবহৃত হয়। তবে সব মানুষের ক্ষেত্রে শুধু HbA1c দিয়েই ডায়াবেটিস নির্ণয় করা যায় না; কিছু বিশেষ শারীরিক অবস্থায় অন্য রক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস, উচ্চ রক্তচাপ বা আগে রক্তে শর্করা বেশি থাকার ইতিহাস থাকলে নিয়মিত স্ক্রিনিং বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমানো ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
৪. রক্তচাপ মাপা
চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আসলে কোনো রক্ত পরীক্ষা নয়Ñরক্তচাপ মাপা। ৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই দীর্ঘদিন থাকতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি রোগ এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণভাবে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছে মাপার সময় ১৪০/৯০ mmHg বা তার বেশি এবং বাড়িতে মাপার ক্ষেত্রে ১৩৫/৮৫ mmHg বা তার বেশি হলে উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়। তবে একটি মাত্র উচ্চ রিডিংয়ের ভিত্তিতে সাধারণত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না; প্রয়োজন হলে বারবার মাপা বা ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেটরি মনিটরিং করা হয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে লবণ কম খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ধূমপান ত্যাগ এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল পরিহার গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হয়।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি
সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, ঢাকা
এসআর