পুদিনাকে আমরা অনেক সময় খাবারের সঙ্গে থাকা সামান্য একটি উপকরণ হিসেবেই দেখি—পানীয়ের গ্লাসে একটি পাতা, নতুন আলুর ওপর ছড়িয়ে দেওয়া কয়েকটি কুচি করা পাতা, কিংবা টুথপেস্টের পরিচিত স্বাদ। কিন্তু পুদিনার ব্যবহার ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ এর চেয়ে অনেক বেশি। প্রাচীনকাল থেকেই হজমের সমস্যা প্রশমনে ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় পুদিনা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এতে থাকা সুগন্ধি ও জৈবসক্রিয় উপাদান শুধু মুখে শীতল অনুভূতি তৈরি করে না, হজমতন্ত্রের বিভিন্ন উপসর্গ, মুখের স্বাস্থ্য এবং সতর্কতা বা সজাগতার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও গবেষণা হয়েছে। পুদিনায় অল্প পরিমাণে পলিফেনলের মতো উপকারী উদ্ভিজ্জ যৌগও থাকে, যেগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
পুদিনায় বিশেষ কী আছে
আকারে ছোট হলেও পুদিনা বেশ পুষ্টিকর একটি ভেষজ। এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে, যা চোখের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভিটামিন সি-ও রয়েছে, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সমর্থন করে। প্রায় ১১ দশমিক ৪ গ্রাম তাজা স্পিয়ারমিন্ট—অর্থাৎ প্রায় দুই টেবিল চামচ—থেকে দৈনিক প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’-এর প্রায় ৩ শতাংশ এবং প্রায় ১৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া যায়, যা দৈনিক প্রয়োজনের আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ শতাংশের সমান। পুদিনায় অল্প পরিমাণে ফোলেট (ভিটামিন বি৯) ও ভিটামিন বি৬ রয়েছে। এগুলো বিপাকক্রিয়া, মস্তিষ্কের কার্যক্রম এবং কোষের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া পুদিনায় রোজম্যারিনিক অ্যাসিডের মতো উপকারী ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট এবং আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও ক্যালসিয়ামের মতো খনিজও রয়েছে। তবে পুদিনাকে প্রধান পুষ্টির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং সুষম খাদ্যের সঙ্গে নিয়মিত পুদিনা যোগ করলে অতিরিক্ত কিছু পুষ্টিগুণ পাওয়ার পাশাপাশি খাবারের স্বাদ বাড়ানো সম্ভব।
পেপারমিন্ট ও স্পিয়ারমিন্টের পার্থক্য কী
পুদিনার শত শত জাত রয়েছে। এর মধ্যে পেপারমিন্ট ও স্পিয়ারমিন্ট সবচেয়ে পরিচিত। দেখতে কাছাকাছি হলেও পেপারমিন্টের স্বাদ অনেক বেশি তীব্র ও ঝাঁজালো। কারণ এতে মেন্থল নামের শীতল অনুভূতি সৃষ্টিকারী উপাদানের পরিমাণ বেশি থাকে। এ কারণেই টুথপেস্ট, চুইংগাম, বদহজমের কিছু ওষুধ এবং খাবারের পর পানীয় হিসেবে পেপারমিন্টের ব্যবহার বেশি। অন্যদিকে স্পিয়ারমিন্টের স্বাদ তুলনামূলকভাবে মৃদু, মিষ্টি ও কম তীব্র। এর স্বাদে সতেজ ও সবুজ ধরনের অনুভূতি থাকায় সালাদ, সস, গ্রীষ্মকালীন পানীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যীয় বিভিন্ন খাবারে এটি বেশি ব্যবহার করা হয়।
পুদিনা কীভাবে হজমে সহায়তা করে
ভারী খাবারের পর এক কাপ পুদিনা চা পান করা বহুদিনের প্রচলিত অভ্যাস। পেটের অস্বস্তি ও বদহজম কমানোর ঘরোয়া উপায় হিসেবেও পুদিনা ব্যবহৃত হয়। এর একটি কারণ হলো মেন্থল। এটি পরিপাকতন্ত্রের পেশি কিছুটা শিথিল করতে পারে এবং কোষে প্রদাহসৃষ্টিকারী কিছু রাসায়নিক উপাদানের কার্যক্রম কমাতে পারে। ফলে পেটের মোচড়, ব্যথা ও পেট ফাঁপার মতো উপসর্গ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
পুদিনার সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্ক কী
পুদিনার সম্ভাব্য উপকারিতা শুধু হজমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানসিক চাপ ও উদ্বেগের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে মেন্থল। মেন্থল হলো এক ধরনের টারপিন, যা প্রকৃতিতে বিভিন্ন উদ্ভিদে পাওয়া যায়। টারপিনই বিভিন্ন উদ্ভিদের স্বতন্ত্র গন্ধ ও স্বাদের জন্য অনেকাংশে দায়ী। পুদিনার মেন্থলযুক্ত সুগন্ধ শিথিলতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে এবং পেশির টান ও শারীরিক অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করতে পারে। পেপারমিন্ট অয়েল তাই অ্যারোমাথেরাপিতেও বহুল ব্যবহৃত হয়।
মুখের স্বাস্থ্যে পুদিনা এত জনপ্রিয় কেন
পরিষ্কার ও সতেজ মুখের সঙ্গে পুদিনার সম্পর্ক আমাদের সবারই পরিচিত। এর সতেজ স্বাদ ও শীতল অনুভূতির কারণে টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ ও মুখের দুর্গন্ধ দূর করার বিভিন্ন পণ্যে পুদিনা বহুল ব্যবহৃত হয়। তবে পুদিনা শুধু দুর্গন্ধ ঢেকে রাখে না; এটি মুখের ভেতরের জীবাণুর ওপরও কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় মুখের মাইক্রোবায়োম বা অণুজীবসমষ্টি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ‘সুপারমিন্ট’ নামের একটি মিশ্রণ—যাতে পেপারমিন্ট, জাপানি মিন্ট, বার্গামট মিন্ট ও স্পিয়ারমিন্টের অ্যাসেনশিয়াল অয়েল ছিল—মুখের দুর্গন্ধ ও মাড়ির রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ব্যাকটেরিয়া কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে মুখের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যও বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তাজা পুদিনা পাতা চিবিয়ে খেলে লালা নিঃসরণ বাড়তে পারে। এর ফলে মুখ পরিষ্কার রাখতে এবং পুদিনার প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদানের সংস্পর্শে মুখের জীবাণুর ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। এটি চিনিযুক্ত মিন্ট বা মিষ্টির তুলনায় ভালো বিকল্প হতে পারে। কারণ অতিরিক্ত চিনি মুখের সেই ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে, যা দুর্গন্ধ ও দাঁতের ক্ষয়ের জন্য দায়ী। চুইংগাম বা মিষ্টি মিন্টের বিপরীতে কাঁচা পুদিনায় বাড়তি চিনি থাকে না, অথচ এটি মুখে সতেজ ও শীতল অনুভূতি দিতে পারে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক,
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ, ঢাকা