হোম > ফিচার > স্বাস্থ্য

ডাউন সিনড্রোমের অতিরিক্ত ক্রোমোজোম

আশিকুর রহমান তালহা

মানুষের শারীরিক গঠন, বিকাশ ও কোষের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ক্রোমোজোম। সাধারণত মানবদেহের কোষে ২৩ জোড়া বা ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে। প্রতি জোড়ায় থাকে দুটি করে ক্রোমোজোম। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের দুটি কপির পরিবর্তে তিনটি কপি থাকে। এই অতিরিক্ত ক্রোমোজোমের উপস্থিতিকে জীববিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ট্রাইসোমি ২১ (Trisomy 21), যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডাউন সিনড্রোমের প্রধান জেনেটিক কারণ হিসেবে বিবেচিত।

বিশ্বজুড়ে প্রতি ৭০০ জনের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে ডাউন সিনড্রোম দেখা যায়। এই ডাউন সিন্ড্রোম একটি ক্রোমোজোমজনিত জেনেটিক অবস্থা। এর ফলে শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট্য, শেখার গতি, ভাষা ও অন্যান্য বিকাশগত ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে কিছু পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তাই ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অনেক সময় ‘পাগল’ বলে থাকে, যা অবমাননাকর। উপযুক্ত চিকিৎসা, শিক্ষা, থেরাপি, পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে তারা সক্রিয় ও অর্থবহ জীবনযাপন করতে পারেন। ডাউন সিনড্রোমের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও বিকাশগত সমস্যার চিকিৎসা এবং ব্যবস্থাপনা বর্তমানে করা সম্ভব হলেও, অতিরিক্ত ২১ নম্বর ক্রোমোজোমটিকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা এখনো আবিষ্কার করা হয়নি। ২১ নম্বর ক্রোমোজোম নিয়ে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে জাপানের একদল গবেষক।

জাপানের Mie University Graduate School of Medicine-এর গবেষক ড. রিয়োতারো হাশিজুমের নেতৃত্বে গবেষকরা CRISPR-Cas9 জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডাউন সিনড্রোমের কোষে থাকা অতিরিক্ত ২১ নম্বর ক্রোমোজোম অপসারণের চেষ্টা করেন। গবেষণাটি ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি PNAS Nexus জার্নালে প্রকাশিত হয়। CRISPR-Cas9 সাধারণত ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশে লক্ষ্যভিত্তিক পরিবর্তন আনার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই গবেষণায় কোনো একটি জিন পরিবর্তনের বদলে লক্ষ্য ছিল আরো বড়—পুরো অতিরিক্ত একটি ক্রোমোজোমকে কোষ থেকে সরিয়ে দেওয়া। তিনটি ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি কপিকে শনাক্ত করে সেটিকে লক্ষ করার জন্য গবেষকরা allele-specific CRISPR-Cas9 পদ্ধতি ব্যবহার করেন। অর্থাৎ তিনটি ক্রোমোজোমের মধ্যে কোনটি অতিরিক্ত, সেটিকে তুলনামূলক নির্দিষ্টভাবে লক্ষ করে একাধিক স্থানে কাট তৈরি করা হয়।

এর ফলে কোষ বিভাজনের সময় লক্ষ করা অতিরিক্ত ক্রোমোজোমটি হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই পদ্ধতিকে গবেষকরা trisomic rescue হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গবেষণাটি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোষ থেকে তৈরি induced pluripotent stem cells (iPSCs) এবং ত্বকের fibroblast কোষে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণার একটি পরীক্ষায় CRISPR প্রয়োগের পর ৪০টি বিশ্লেষিত কোষের মধ্যে ১৫টিতে ৪৬টি ক্রোমোজোমের স্বাভাবিক সংখ্যা পাওয়া যায়। অর্থাৎ ওই পরীক্ষায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ কোষে ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের অতিরিক্ত কপি অপসারণ করে disomy 21 অবস্থা পাওয়া যায়। আরো বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্দিষ্ট CRISPR পদ্ধতিতে তৈরি ৭২টি ক্লোনের মধ্যে ২২টিতে disomy 21 পাওয়া যায়, যা প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। শুধু ক্রোমোজোমের সংখ্যা কমেছে কি না এবং অতিরিক্ত ক্রোমোজোম অপসারণের পর সংশোধিত কোষের জিনের প্রকাশের ধরন, কোষের বৃদ্ধির গতি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সক্ষমতার মতো কিছু বৈশিষ্ট্যও স্বাভাবিক কোষের দিকে ফিরে আসার প্রমাণ পাওয়া যায়। দেখা যায়, ক্রোমোজোমের সংখ্যা স্বাভাবিক করার সঙ্গে কিছু cellular phenotype-ও উন্নত হয়েছে। গবেষণাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, গবেষকরা শুধু iPSC নিয়ে কাজ করেননি। Fibroblast-এর মতো পার্থক্য করা কোষেও পদ্ধতিটি পরীক্ষা করা হয়েছে। এমনকি বিভাজন না করা কোষেও অতিরিক্ত ক্রোমোজোম অপসারণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের কোষে এই কৌশল প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফল আশাব্যঞ্জক হলেও এখনো ডাউন সিনড্রোমের চিকিৎসা বা সম্পূর্ণ নিরাময়ের পদ্ধতি নয়। কারণ পুরো গবেষণাটি হয়েছে পরীক্ষাগারে পৃথক মানবকোষের ওপর। কোনো ডাউন সিনড্রোম আক্রান্ত মানুষের শরীরে CRISPR প্রয়োগ করে অতিরিক্ত ২১ নম্বর ক্রোমোজোম অপসারণ করা হয়নি। ফলে মানুষের শরীরে একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো অজানা।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা। পুরো একটি ক্রোমোজোমে একাধিক জায়গায় CRISPR দিয়ে কাট তৈরি করলে শুধু লক্ষ করা ক্রোমোজোমই হারাবে—এমন নিশ্চয়তা সব পরিস্থিতিতে দেওয়া যায় না। গবেষণায়ও দেখা গেছে, অবশিষ্ট ক্রোমোজোমে কিছু জিনগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই মানুষের শরীরে প্রয়োগের আগে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনগুলোর ঝুঁকি আরো ভালোভাবে বোঝা এবং নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। ডাউন সিনড্রোমের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্রোমোজোমকে লক্ষ করে সরাসরি কাজ করার এই পদ্ধতি ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক খুলে দিয়েছে। গবেষকদের মতে, allele-specific পদ্ধতিটি ভবিষ্যতে ট্রাইসোমি ২১-কে লক্ষ করে আরো উন্নত চিকিৎসা-পদ্ধতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। একটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোমকে কোষের ভেতর থেকে লক্ষ করে সরিয়ে দেওয়ার এই সাফল্য তাই শুধু ডাউন সিনড্রোম গবেষণার জন্য নয়, বরং ক্রোমোজোমজনিত বিভিন্ন রোগের সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্যও নতুন প্রশ্ন ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।

লেখক : স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি বিভাগ, ময়মনসিংহ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেস

তথ্যসূত্র : PNAS Nexus

হাড়ের ক্যানসারে ঝুঁকির কারণ

ডেঙ্গুর উপসর্গে ভিন্নতা

একদিনে ডেঙ্গুতে ৭ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৫৯৩

হামের উপসর্গে এক দিনে ছয় শিশুর মৃত্যু

মানসিক অসুস্থতা ও সহিংসতার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক

চীনের ইউরোলজি সম্মেলনে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের গবেষণা উপস্থাপন

ডিজিটাল হাজিরায় স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি মনিটরিং করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ডেঙ্গুতে আরো ৮ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৭৩৩

২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে ৮ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৩২

হামের উপসর্গে আরো ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ৯৬৮ জন