হোম > ফিচার > স্বাস্থ্য

টিকা সংকটে বাড়ছে জলাতঙ্কের ঝুঁকি

বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস আজ

গোলাম মোস্তফা

সাত বছরের মিনহাজ স্কুল থেকে ফেরার পথে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হলে তার দেহে গভীর ক্ষত হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে জলাতঙ্কের (র‌্যাবিস) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। কিন্তু তৃতীয় ডোজের সময় এসে হাসপাতাল কিংবা বাজারে টিকা পাওয়া যাচ্ছিল না বলে জানান তার বাবা মঞ্জুর হোসেন। পরে বাধ্য হয়ে গাজীপুর থেকে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ছেলেকে নিয়ে আসেন তিনি। গতকাল রোববার শিশুটিকে তৃতীয় ডোজের টিকা দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজধানীতে কোথাও কোথাও টিকা পাওয়া গেলেও ঢাকার বাইরে জলাতঙ্কের টিকার সংকট তীব্র। ফার্মেসি থেকে কিনতে গেলে টিকার দামও কয়েকগুণ বেশি দিতে হচ্ছে। প্রাণীর কামড়ের পর চিকিৎসকের পরামর্শে টিকা নিতে গিয়ে অনেক জায়গায় তা পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয়ভাবে না পেয়ে কেউ কেউ টিকার সন্ধানে ঢাকায় আসছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকার তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে কুকুর, বিড়াল, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে আহতরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। প্রয়োজনের সময় টিকা না পেয়ে অনেকে বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সরবরাহ সংকটে অনেকের টিকার ডোজও সম্পন্ন হচ্ছে না নির্ধারিত সময়ে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েক মাস ধরেই চাহিদার তুলনায় টিকার সরবরাহ কম। বরাদ্দ পাওয়া টিকার মজুত অনেক হাসপাতালে বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। ফলে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) শাখার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে কুকুর, বিড়াল ও অন্যান্য প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়ে মারা যায় ৫০ জনের মতো। আর দেশে গড়ে আক্রান্ত হয় ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষ। এর মধ্যে কুকুরের কামড়ে ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্ক রোগই হয়। দেশে জলাতঙ্কে ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৫ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর জলাতঙ্ক বা র‌্যাবিসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে প্রায় ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। এমন একটি প্রেক্ষাপটে আজ জলাতঙ্ক দিবস। প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস’ বা ‘অ্যান্টি র‌্যাবিস ডে’ হিসেবে পালন করা হয়। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হলো—জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। বিশ্বব্যাপী ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে মানুষের জলাতঙ্কজনিত মৃত্যু শূন্যে নামানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসকরা জানান, কুকুর, বিড়াল বা শিয়ালের কামড়ে গভীর ক্ষত হয়ে রক্তপাত হলে এআরভি (অ্যান্টির‍্যাবিস ভ্যাকসিন) ও আরআইজি (র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন) দিতে হয়। তবে প্রাণীর লেহন, আঁচড় বা ঘর্ষণের ক্ষেত্রে শুধু এআরভি টিকাই যথেষ্ট। এর মধ্যে আরআইজি টিকার সরবরাহ দীর্ঘদিন ধরে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের অনেক সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

৯ মাসেই এক লাখের বেশি রোগী

সরেজমিনে গতকাল মহাখালীর সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ঘুরে রোগীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। তাদের বেশির ভাগই দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসেছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিন না পেয়ে ঢাকায় টিকা নিতে এসেছেন। বাইরে থেকে কিনতে গেলে দাম কয়েকগুণ বেশি। অনেকেই জানান, কুকুর ও বিড়ালে কামড়ানোর পর চিকিৎসক ভ্যাকসিন নিতে বললেও ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে না।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বহির্বিভাগে টিকাদানে নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সরা জানান, প্রাণীর কামড়ের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। এ হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,২০০ রোগী আসছেন। হাসপাতালের পরিসংখ্যানেও রোগীর চাপ বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের শিকার হয়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৩ হাজার ৩৮০ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩। চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার ৫৫৮।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. আরিফুল বাসার বলেন, জলাতঙ্ক একটি প্রাণঘাতী রোগ। কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, বাদুড়, বেজি ও বানরসহ বিভিন্ন প্রাণী জলাতঙ্কের ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। এসব প্রাণী আক্রান্ত হলে এবং কামড় দিলে মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুও জলাতঙ্কে সংক্রমিত হতে পারে। প্রাণীর কামড়ের পর আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে হাসপাতালে আসতে হবে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভ্যাকসিন এবং প্রয়োজন হলে আরআইজি নিতে হবে। বিশেষ করে মাথা, মুখ ও ঘাড়ের কাছাকাছি কামড়, গভীর ক্ষত বা রক্তপাতের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে কোনোভাবেই দেরি করা উচিত নয়।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আসমা খান বলেন, আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৬৫ শতাংশই বিড়ালের কামড়ের শিকার। এর মধ্যে বেওয়ারিশ কুকুর, বিড়ালের পাশাপাশি পোষা বিড়ালের কামড়ের ঘটনাও রয়েছে। নারী ও শিশুরা তুলনামূলক বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বেজিসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের পর রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী র‌্যাবিস ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। ক্ষতের ধরন ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী র‌্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আরআইজি) এবং টিটেনাসের টিকাও প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণত সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নিয়মিত সেবা দেওয়া হয়।

হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ জলাতঙ্কের টিকার চাহিদা রয়েছে। সিডিসি শাখার অধীনে কৌশলগত পরিকল্পনা বা অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) আওতায় জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতালে র‌্যাবিস ভ্যাকসিন বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু অপারেশন প্ল্যান না থাকায় জেলা পর্যায়ে টিকার তীব্র সংকট রয়েছে। বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাসে সমস্যা বেশি ছিল। বর্তমানে সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। যদিও সরকারি হাসপাতালে কর্মকর্তারা জানান, সরকারিভাবে টিকার জোগান না থাকায় ঢাকার বাইরে সংকট রয়েছে।

এ ব্যাপারে সিডিসির সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, চলতি অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ডোজ র‌্যাবিস ভ্যাকসিন এবং ৩ লাখ ডোজ র‌্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন সরবরাহের কার্যক্রম রয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ও ব্যবহারের তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পরবর্তী চাহিদা জানায়। সেই অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়। তবে এখন কোনো টিকার সংকট নেই।

বাংলাদেশে অল্প বয়সে আকস্মিক মৃত্যুর প্রধান পাঁচ কারণ

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেছে চীনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের মৃত্যু, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর শোক

ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ ২১৫৮ আক্রান্ত, মৃত্যু আরো ৬ জনের

হামের উপসর্গে আরো ৯ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩৪১

মাত্র ৩০ সেকেন্ডে মুড ভালো করার উপায়

একদিনে ডেঙ্গুতে ৮ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৪৩২

হামের উপসর্গে আরো ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১০৬৪

২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরো ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১২৬৫

ডেঙ্গুতে এ বছর মৃত্যু ২১১, আক্রান্ত ৭০ হাজার ১০৪