ফ্যাশন
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বৈচিত্র্যের শেষ নেই। আর এই পালাবদলে সাড়ম্বরে প্রকৃতিতে বর্ষার আগমন ঘটে। সারা বাংলায় বর্ষার আগমনে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও আনন্দের মায়াবী দৃশ্যপট যেমন চোখে পড়ে, তেমনি এই বৃষ্টিবাদলের বিড়ম্বনাও কম নয়।
বর্ষায় কখনো আকাশ মেঘকালো করে ঝুম বৃষ্টি নামে, আবার কখনো সারা দিন টিপটিপ করে বৃষ্টি ঝরে। কখনো অঝোর ধারায় বৃষ্টিতে পথঘাট ডুবে যাওয়ায় পথচারীদের স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাও সমস্যার সম্মুখীন হয়। সেইসঙ্গে দৈনন্দিন কাজকর্মে টানা বৃষ্টির দিন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে ভীষণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়া অফিসগামী নারী-পুরুষের জন্যও অবিশ্রাম বৃষ্টি ছেদ টেনে দেয় স্বস্তিময় কাজকর্মে। পথ চলতে গিয়ে পোশাক-আশাক হয়ে যায় কাদায় মাখামাখি। নগরজীবনে বৃষ্টির বিড়ম্বনা যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়। তারপরও বর্ষা এক নির্মল সজীবতা নিয়ে প্রকৃতিকে নতুন সাজে সাজিয়ে দেয়।
বর্ষার দিনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পোশাক নির্বাচন। কর্মজীবী অথবা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রীদের এই আবহাওয়ায় পোশাক নির্বাচনে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। অঝোরে রিমঝিম বৃষ্টির কারণে প্রায়ই জামাকাপড় ভিজে যায়। সেইসঙ্গে গরমের গুমোট ভাব তো থাকছেই। তাই গরম আর বৃষ্টি—এ দুটোর কথা মাথায় রেখেই বর্ষাকালে পোশাক পরতে হবে। তবে চিন্তাভাবনা করে কাপড় বাছাই করলে বাড়তি ঝামেলা কিছুটা হলেও এড়িয়ে চলা সম্ভব।
বর্ষার সময় আকাশের রঙ দেখে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, শার্ট-প্যান্ট ও জুতো নির্বাচন করা বিশেষ প্রয়োজন। না হলে আচমকা বৃষ্টিতে সব আয়োজন ভন্ডুল হয়ে যাওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া যা-ই হোক, বছরের অন্যান্য সময়ের মতো সুতি কাপড় পরে বের হলে একটু সমস্যায় পড়ার শঙ্কা থেকেই যায়। বৃষ্টিতে সুতি কাপড় ভিজলে শরীরে সেঁটে গিয়ে শুধু অস্বস্তি বাড়ায় না, শুকাতেও অনেক সময় লাগে। এতে ঠান্ডা-কাশি ও জ্বর হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাছাড়া রোদে না শুকালে কাপড়ে গন্ধ হয়।
বর্ষায় তাই ব্যবহার করা উচিত এমন কাপড়, যা ভিজলে বাতাসে দ্রুত শুকিয়ে যায়। এক্ষেত্রে বর্ষার উপযোগী হলো কৃত্রিম তন্তুর কাপড়। তবে এ কাপড়ে অনেকের ত্বকে অ্যালার্জি বা র্যাশ উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে ভালো মানের জর্জেট, সিল্ক বা দেশি ভয়েল বর্ষাকালের জন্য উপযোগী ও মানানসই কাপড়। তবে যে কাপড়ই হোক, তা ভারী ও পুরু বা সুতির না হলে বর্ষায় পরা যেতে পারে।
ঘর থেকে বাইরে বেরোনোর আগে যদি মনে হয় বৃষ্টি আসতে পারে, তাহলে শাড়ির ক্ষেত্রে সিল্ক, জর্জেট বা শিফনকে প্রাধান্য দেওয়াই ভালো। বৃষ্টিতে ভিজলে খুব সহজেই শুকিয়ে যায় বলে হাফ সিল্কের শাড়িগুলো বেশ উপযোগী। সালোয়ার-কামিজের ক্ষেত্রেও সিল্কজাতীয় ড্রেস অগ্রাধিকার দেওয়াটা যেমন উত্তম, পাশাপাশি প্যান্ট-শার্টের ক্ষেত্রেও বৃষ্টি-উপযোগী ড্রেস পরাটাই সমীচীন। আর পোশাকের রঙ যত গাঢ় আর উজ্জ্বল হবে, ততই ভালো। কেননা সিল্ক ও গাঢ় রঙের শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ কিংবা প্যান্ট-শার্ট বৃষ্টির পানি ও কাদা-ময়লায় নষ্ট হওয়া থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পায়।
নীল ও গাঢ় রঙের পোশাকের প্রাধান্য
বর্ষায় প্রকৃতি যেমন সেজে ওঠে, তেমনি তার সঙ্গে মেতে ওঠে প্রকৃতি প্রিয় মানুষগুলো। বর্ষণমুখর দিনের মনকাড়া রঙ ‘নীল’। প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে মেয়েরা গাঢ় নীল ও সবুজ রঙের পোশাক পরে। এ সময় সাদা কাপড় যেমন বৃষ্টির দিনে মানানসই নয়, তেমনি কালো কাপড়ও পরা উচিত নয়; কারণ কালো কাপড় ভিজে গেলে ছোপছোপ দাগ হতে পারে।
শুধু নীলই নয়, বর্ষার এই সময় প্রকৃতিতে উজ্জ্বল রঙের সমারোহ ঘটে। তাই বর্ষার সময়ে গাঢ় রঙগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বাদল দিনে পোশাকের গাঢ় রঙ ছাপিয়ে দেয় আশপাশের ধূসরতাকে। গাঢ় নীল, গাঢ় হলুদ, কমলা, রানি, গোলাপি অথবা গাঢ় সবুজ রঙগুলো প্রাধান্য পায় বর্ষার পোশাকে। প্রিন্টেড কাপড়ও বাদলা দিনের পরিবেশ-উপযোগী পোশাক।
বর্ষায় বিড়ম্বনার যেমন কমতি নেই, তেমনি বর্ষণমুখর সতেজ মুহূর্ত শুধু উপভোগ্য নয়; আনন্দেরও। সবকিছু মিলে বৃষ্টির দিনে জীবনে যেমন প্রগাঢ় কাব্যিক উচ্ছ্বাস প্রবাহিত হয়, একইভাবে মেঘলা দিনের মুখভার আকাশ আর ঘনঘোর আবহ যেন বাংলার চিরায়ত রূপটাকে জাগিয়ে তোলে ভিন্ন এক রঙের উজ্জ্বলতায়। নিসর্গ আর জীবনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে পাখির পালকের মতো কোমল মায়াবী মুগ্ধতা।