হোম > ফিচার > আমার জীবন

মাহাথিরের দেশ মালয়েশিয়ায়

তাহমিনা পারভীন

মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসীসমৃদ্ধ একটি দেশ। মালয় উপদ্বীপ ও বোর্নিওতে ঔপনিবেশিক শক্তির অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে চীনা ও ভারতীয় শ্রমিকদের অভিবাসন শুরু হয়েছিল। আর সেই ধারাবাহিকতাই হয়তো আজ অবধি মালয়েশিয়ায় অভিবাসী শ্রমিকদের জোয়ার অব্যাহত রেখেছে।

মালয়েশিয়া ও মাহাথির মোহাম্মদ—দুটি নামই যেন একে অপরের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে! একজন ব্যক্তির নামের সঙ্গে যখন একটি দেশের নাম জড়িয়ে যায়, তখন বোঝা যায় দেশটির অগ্রগতিতে তার ভূমিকা কতটা প্রাসঙ্গিক! ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনকারী দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি মাত্র বছর বিশেকের মধ্যেই কেবল এশিয়ার নয়, বিশ্বের মানচিত্রে দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে রীতিমতো উন্নত দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

খুব ভোরে তখন কেবল ভোরের আলো ফুটি-ফুটি করছে, কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে অবতরণ করলাম। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের অন্যতম বৃহৎ জোগানদাতা মালয়েশিয়ার প্রবাসী বাংলাদেশিরা! এয়ারপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে লাগেজ নেওয়ার সময় আমার ভারী লাগেজটা তুলতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। আমার দুরবস্থা দেখে বাংলাদেশি এক তরুণ এগিয়ে এলো আমাকে সাহায্য করতে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সে প্রায় ১২ বছর ধরে মালয়ি মেয়েকে বিয়ে করে মালয়েশিয়ায় বসবাস করছে।

এয়ারপোর্ট থেকে মূল শহরে যাওয়ার পথে রাস্তার দুপাশে সারি সারি পাম গাছ চোখে পড়ে। পাম মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান কৃষিজাত পণ্য। মাইলের পর মাইল সবুজ পাম গাছে লাল রঙের পাম ফলের অপূর্ব শোভা দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ‘মন্ট কিয়ারা’ নামের আবাসিক এলাকায় কন্যা-জামাতার বাসায়।

কুয়ালালামপুর শহরটি আয়তনে তেমন বড় নয়। ঢাকার চেয়ে ছোট শহর। তবে জনসংখ্যা কম হওয়ার কারণে জীবনযাপন স্বাচ্ছন্দ্যময়। পাহাড়ি উঁচু-নিচু রাস্তা। রাস্তায় কোনো যানজট নেই! গাড়ির হর্নের বিরক্তিকর আওয়াজ নেই। শান্ত ছিমছাম শহর।

কুয়ালালামপুরে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের সময় চোখে পড়ে মাহাথির মোহাম্মদ নির্মিত মালয়েশিয়ার উন্নয়নের প্রতীক ‘পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার’। মাটির ওপরে-নিচে মিলিয়ে টুইন টাওয়ারে মোট ৯৩টি তলা রয়েছে।

কুয়ালালামপুরের চিড়িয়াখানা দেখার সুযোগ হলো। বিশাল চিড়িয়াখানা। এখানে বাঘ, সিংহ ও নেকড়ে ছাড়াও বিরল প্রজাতির পান্ডা, পেঙ্গুইন ও সরীসৃপ রয়েছে। দর্শনার্থীদের সব প্রাণী সহজে দেখার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। দর্শকরা পুরো চিড়িয়াখানাটি এই গাড়িতে একবার চক্কর দিয়ে আসতে পারেন। এরপর নিজেদের ইচ্ছামতো ঘুরে দেখতে পারেন। চিড়িয়াখানার কোনো প্রাণীকে খাবার দেওয়া রীতিমতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

কুয়ালালামপুরের ‘তামান বুডাং’ বার্ড পার্কটিও দেখার মতো! সম্পূর্ণভাবে আচ্ছাদিত পার্কটিতে ময়ূর, ম্যাকাও, টিয়া, কাকাতুয়াসহ প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে! পোষা পাখির মতো ম্যাকাও বা কাকাতুয়া উড়ে এসে নিঃসংকোচে দর্শকদের হাতে বসে!

বার্ড পার্কে আকর্ষণীয় ‘বার্ড শো’ হয়। বেশ বড়সড় আকৃতির কয়েকটি ম্যাকাও উড়ে উড়ে দর্শনার্থীদের বিভিন্ন কসরত দেখায়!

ব্যস্ত কোলাহলময় কুয়ালালামপুর শহরের মাঝেই গড়ে তোলা এক ঘন সবুজ দ্বীপ বোটানিক্যাল গার্ডেন! যেন ইট, কাঠ ও পাথরের শহরের বুকে এক অনাবিল প্রশান্তির ছোঁয়া! বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর প্রজাপতি পার্ক! সেখানে গেলে দেখা যাবে অসংখ্য রঙের এবং গড়নের হাজার হাজার প্রজাপতির ছন্দময় নৃত্য!

কুয়ালালামপুর অন্যতম আকর্ষণ ‘কনভেনশন সেন্টারে’র কুয়ালালামপুর অ্যাকোয়ারিয়াম। অ্যাকোয়ারিয়ামটির সবচেয়ে আকর্ষণের প্রাণীটি হলো এখানকার বিশাল আকৃতির হাঙর! কাচের তৈরি টানেলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বিশালাকৃতির হাঙরটি দেখে এমন একটা অনুভূতি হয়—এক্ষুনি বুঝি হাঙরটি আক্রমণ করে বসবে! বিষয়টি রীতিমতো ভীতিজাগানিয়া!

মালয়েশিয়ার নতুন রাজধানী পুত্রজায়া। পুত্রজায়ায় আছে বিখ্যাত পুত্রা মসজিদ। গোলাপি রঙের গম্বুজবিশিষ্ট গোলাপি রঙের গ্রানাইট পাথরে তৈরি এই মসজিদ। মসজিদের অদূরেই রয়েছে সবুজ ডোমবিশিষ্ট মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অফিস ‘পারদানা পুত্রা’। পুত্রাজায়াকে বলা হয় গার্ডেন সিটি। এখানে তৈরি হয়েছে জমকালো পুত্রা ব্রিজ ও অপূর্ব সুন্দর পুত্রা লেক! আছে প্রায় ৭০০ প্রজাতির গাছপালা-শোভিত অনিন্দ্য সুন্দর বোটানিক্যাল গার্ডেন! এককথায় প্রকৃতির সৃষ্টি আর মানুষের সৃষ্টি—দুইয়ে মিলে পুত্রাজায়ার সৌন্দর্যকে করে তুলেছে অনবদ্য!

পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও সবুজ বনানী ঘেরা মালয়েশিয়ার পাহাং জেলার ‘ক্যামেরন হাইল্যান্ড’-এর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য শোভা পর্যটকের চোখ মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেয়! কুয়ালালামপুর থেকে সড়কপথে তিন ঘণ্টার যাত্রাপথ। অসংখ্য বাঁকে ভরা পাহাড়ি রাস্তা! এত বাঁক যে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। যাত্রাপথে চোখে পড়ল মালয়েশিয়ার গ্রামীণ জীবন! কৃষকের বাড়ির আঙিনায় হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল এবং মাঠে কৃষকের ফসলের পরিচর্যা। কোনো পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার কলকল রবে ছুটে চলা মন ভরিয়ে দিল!

ঘণ্টা দু-এক চলার পরেই শুরু হলো ক্যামেরন হাইল্যান্ডের আসল সৌন্দর্য! চোখে পড়ল মাইলের পর মাইল জুড়ে পাহাড়ের গায়ে চায়ের বাগান! সে তো বাগান নয়, যেন কোনো নিপুণ শিল্পীর হাতে আঁকা ছবি। চায়ের বাগান যে এত অপরূপ সুন্দর হতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন!

ক্যামেরন হাইল্যান্ডসে চা প্রক্রিয়াজাত করার একটি কারখানায় যাওয়া হলো। দেখা গেল চা প্রক্রিয়াজাত করার বিভিন্ন পদ্ধতি। এখানকার একটি ‘স্ট্রবেরি’ খামারেও যাওয়া হলো। স্ট্রবেরি খামারের ভেতরে ঢোকার গেটের কাছেই একজনকে বসে থাকতে দেখা গেল। আমাদের বাংলায় কথা বলতে শুনে ভদ্রলোক আমাদের ডেকে বাংলায় কথা বলতে শুরু করলেন। জানা গেল তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় বসবাস করছেন। তিনি আমাদের একটা বাস্কেট দিয়ে জানালেন দর্শনার্থীরা বাগান থেকে নিজেদের পছন্দমতো স্ট্রবেরি তুলে খেতে পারে। শুধু বাস্কেটে যে পরিমাণ ফল তুলবে, ফেরার সময় ওজন করে তার দাম পরিশোধ করতে হবে।

কুয়ালালামপুরে যেকোনো শপিং মল বা রেস্তোরাঁয় গেলেই বাংলায় কথা বলতে শোনা যায়। কারণ মালয়েশিয়া বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য শ্রমবাজার। এখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে! কিন্তু শুধু মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ন্যূনতম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। মালয়েশিয়া থেকে ফেরার পথে এক বাংলাদেশি ভদ্রলোক ২১-২২ বছরের এক তরুণকে বলল, ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় আমার সাহায্য নিতে। আমি ইমিগ্রেশন পার হয়ে ছেলেটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সে আমাকে ডাকল ইমিগ্রেশন অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে, কারণ সে ইংরেজি বলতে বা বুঝতে পারে না। আমি এগিয়ে গিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসারকে তার সাময়িক সময়ের জন্য বাংলাদেশে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করায় সে সহজে ইমিগ্রেশন পার হতে পারল। এসব শ্রমিকের ন্যূনতম ইংরেজি বলা এবং বোঝার মতো প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

মালয়েশিয়ার উন্নয়ন, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন—সব মিলিয়ে এই সফর আমার মনে দীর্ঘদিন এক অনন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের দাম ১০ ডলার, অচল পাম্পের ডিসপ্লে!

ইরান যুদ্ধে হুথিদের ত্বরিত অগ্রযাত্রা, বদলে দিচ্ছে যুদ্ধের পুরো সমীকরণ

জেলা-উপজেলায় মিলবে ডায়ালাইসিস সেবা

আর্সেনালের জয়, চেলসির হতাশা, লিভারপুলের গোলখরা

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র ইউরোপ ছাড়িয়ে আফ্রিকার মরুভূমিও

সৌদি আরবে ১২ হাজার প্রবাসী বহিষ্কার

সৌদি–মার্কিন যেই ভুলে হুথিদের জয়, বেতনভুক্ত অস্তিত্বহীন ভূতুড়ে সেনা

স্বর্ণজয়ী হয়েও সন্দ্বীপের সাঁতারুদের এবার জেলায় যাওয়া অনিশ্চিত

হাসিনা কোন সালের ডিসেম্বরে আসবে, প্রশ্ন হুইপ দুলুর

সাইকেলের দুই চাকায় জ্বলে শিক্ষার স্বপ্ন