ঢাকার সড়কে নামল নারীদের জন্য বিশেষ ‘পিংক বাস’। অফিসে যাওয়ার সময় নারী যাত্রীদের আর সিএনজিচালকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি করতে হবে না এবং পুরুষ যাত্রীদের সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠতে হবে না। সামনের মহিলা আসনগুলোয় পুরুষ যাত্রীদের বসিয়ে রেখে হেলপারও আর চেঁচিয়ে বলতে পারবে না, ‘আফা, পিছে গিয়ে দাঁড়ান।’ কিংবা ধাক্কা দিয়ে বলতে পারবে না, ‘একটু সরে দাঁড়ান।’
এখন আছে নারীদের পিংক বিআরটিসি মহিলা বাস! আর এই মহিলা সার্ভিসে—নিজেদের বাস, নিজেদের ড্রাইভার, নিজেদের হেল্পার!
রাজনীতির মাঠে প্রতিশ্রুতি দেওয়া খুব সহজ—মাইক হাতে নিলেই প্রতিশ্রুতির বন্যা। তবে বাস্তবে নামাতে গেলেই অনেক কিছুই আবার ‘প্রক্রিয়াধীন’ হয়ে যায়। তার মধ্যেই একটা প্রতিশ্রুতি পূর্ণতা পেল, বেশ ধুমধাম করে রাস্তায় নামছে—মহিলা পিংক বাস! নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঢাকায় চালু হয়েছে বিশেষ মহিলা বাস সার্ভিস। বিআরটিসির উদ্যোগে চালু হওয়া ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’ প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ১০টি রুটে চলাচল করবে। নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত এসব বাসে ই-টিকেটিং, সিসি ক্যামেরা ও জিপিএসের সুবিধা রাখা হয়েছে।
ঢাকার সাধারণ গণপরিবহনে নারীদের যাতায়াতের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই স্বস্তিদায়ক নয়। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা, উঠতে-নামতে বিড়ম্বনা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, কিংবা অনেক সময় পুরুষ যাত্রী, চালক, হেলপার ও কন্ডাক্টরদের অস্বস্তিকর আচরণ—এসব কারণে গণপরিবহনে নারীদের নানা বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। তাই নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।
এখন থেকে সকালে সাজুগুজু করে মেয়েরা বাসে উঠে ফুরফুরে মেজাজে অফিসে যাবে। খোলা জানালা দিয়ে বাতাস এসে চুল ওড়াবে! কিন্তু খারাপ নজরে তাকিয়ে কটূক্তি করার জন্য বাসে কেউ থাকবে না। এমন সুস্থ পরিবেশে নারীদের কথা ভাবতে ভালোই লাগছে! চলার পথ সহজ হলে জীবনটা আসলেই সুন্দর মনে হয়! গোলাপি মহিলা বাস সবার মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিভিন্ন পোস্টে ভরে গেছে। তবে যার যার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মানুষ সেভাবেই ইতিবাচক ও নেতিবাচক মতামত প্রকাশ করছেন। তবে নারীদের মধ্যে এক মহা স্বস্তির আনন্দ বয়ে যাচ্ছে। সেই আনন্দের অভিব্যক্তি তারা এভাবেই প্রকাশ করছেন।
এক নারী তার পোস্টে লিখছেন, ‘অফিসে পৌঁছানোর আগেই মুড ফ্রেশ, মন ফুরফুরে, আর মুখে একটাই গান—‘আজ আমি কোথায় যাব… শুধু বাসে চড়বো!’
নারীদের অফিসযাত্রাকে যদি সত্যিই এমন নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও আনন্দময় করা যায়, তাহলে বাসে চড়াও হবে এক নতুন আনন্দের নাম!’
আরো লিখছেন, ‘রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশ, সনদ, গণভোট, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ কিংবা কোন প্রতিশ্রুতি কোথায় আটকে আছে—এসব নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তাদের বিশ্লেষণ চালিয়ে যাক।
আমরা আপাতত একটি বিষয় নিয়েই খুশি হতে পারি—নারীদের জন্য নিরাপদ ও নারী পরিচালিত গণপরিবহনের একটি উদ্যোগ অন্তত বাস্তবে রাস্তায় নামছে। কারণ গণপরিবহনে নারীদের হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার যে বাস্তবতা, সেখানে পিংক বাস শুধু গোলাপি রঙের একটি বাস নয়; এটি নারীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক চলাচল নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।’
১৮ আগস্ট তেজগাঁওয়ে এই বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়। আর ১৯ আগস্ট থেকে রাস্তায় চলছে এই বাস। বিআরটিসি জানায়, প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরে ১৩টি রুটে মোট ১৪টি মহিলা বাস সার্ভিস চালু হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাস চলবে। ঢাকার বাসগুলো ১৬০টি স্টপেজে যাত্রীসেবা দেবে। চট্টগ্রামে ১২টি এবং বগুড়ায় ১৬টি স্টপেজ বাসগুলো রাখা হয়েছে। বাসগুলো মহিলা চালক ও মহিলা কন্ডাক্টরদের মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যাত্রীদের পাশাপাশি বাসে কর্মরত নারী চালক ও সহকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাসগুলোয় সিসি ক্যামেরা ও জিপিএস সংযোজন করা হয়েছে।