হোম > ফিচার > নারী

কর্মজীবী নারীর প্রতিদিনের মানসিক সংগ্রাম

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

সকাল ৬টা। অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। দিনের শুরুতেই মাথায় ঘুরতে থাকে একগুচ্ছ হিসাব—সন্তানের টিফিন কী হবে, স্বামীর সকালের নাশতা, শ্বশুর-শাশুড়ির ওষুধ খাওয়ার সময়, গৃহকর্মীর আসা-না আসা, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, জমা দেওয়ার রিপোর্ট, বিকালের বাজার, রাতে কী রান্না হবে—সবকিছু যেন একই সঙ্গে তার মস্তিষ্কে চলতে থাকে। পরিবারের সবাইকে প্রস্তুত করে নিজের জন্য কয়েক মিনিট সময়ও না নিয়ে ছুটে যান কর্মস্থলে। অফিসে তিনি একজন দক্ষ কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যাংকার, প্রকৌশলী কিংবা উদ্যোক্তা। সেখানে তাকে প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয় নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারত্ব। সারা দিনের কাজ শেষে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখনো তার জন্য অপেক্ষা করে আরেকটি পূর্ণকালীন দায়িত্ব—সংসার।

এভাবেই একজন কর্মজীবী নারীর প্রতিটি দিন যেন দুটি পূর্ণকালীন চাকরির সমান। পার্থক্য শুধু একটাই—অফিসের কাজের জন্য তিনি বেতন পান, কিন্তু ঘরের অধিকাংশ কাজের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি কিংবা নির্ধারিত বিশ্রাম নেই।

দ্বৈত দায়িত্বের অদৃশ্য চাপ

বর্তমান সময়ে নারীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, গবেষণা, ব্যবসা, শিল্প, প্রযুক্তি—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারকেও আর্থিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করলেও অধিকাংশ নারী সংসারের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাননি; বরং চাকরির পাশাপাশি আগের সব গৃহস্থালির কাজও তাদের কাঁধেই থেকে গেছে।

একজন পুরুষ অফিস থেকে ফিরে বিশ্রাম নিলে সেটি স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। কিন্তু একজন নারী যদি অফিস শেষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে চান, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তাকে শুনতে হয়—‘এত ক্লান্ত হওয়ার কী আছে?’ কিংবা ‘সংসারের কাজ তো করতেই হবে।’

এই সামাজিক প্রত্যাশা ধীরে ধীরে তার মানসিক চাপ আরো বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ মেয়াদে এই চাপ উদ্বেগ, অবসাদ, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

অদৃশ্য মানসিক শ্রমের কোনো হিসাব নেই

শুধু রান্না করা বা ঘর পরিষ্কার করাই সংসারের কাজ নয়। এর বাইরেও রয়েছে এক বিশাল অদৃশ্য দায়িত্ব, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মানসিক শ্রম বলা হয়।

পরিবারের কার কখন ডাক্তার দেখাতে হবে, কোন বিল কবে জমা দিতে হবে, সন্তানের স্কুলের কার্যক্রম, পরীক্ষার সময়সূচি, বাজারের তালিকা, আত্মীয়দের খোঁজখবর, উৎসবের প্রস্তুতি—এসব বিষয়ের পরিকল্পনাও মনে রাখার দায়িত্ব অনেক পরিবারেই নারীর ওপর বর্তায়।

এই কাজগুলোর কোনো দৃশ্যমান স্বীকৃতি নেই, কিন্তু এগুলোর জন্য সারাক্ষণ মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখতে হয়। ফলে বিশ্রামের সময়েও তার মন বিশ্রাম পায় না। একজন মানুষ শারীরিকভাবে বসে থাকলেও মানসিকভাবে অবিরাম কাজ করতে পারেন—এটাই মানসিক শ্রমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

কর্মক্ষেত্রের চাপ

অনেকে মনে করেন, অফিসে যাওয়াই যেন নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক। বাস্তবে কর্মক্ষেত্রও নানা চ্যালেঞ্জে ভরা।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, নতুন দক্ষতা অর্জন, সহকর্মীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, পদোন্নতির প্রত্যাশা, চাকরির নিরাপত্তা এবং লক্ষ্য পূরণের চাপ—সব মিলিয়ে কর্মজীবনও কম কঠিন নয়। অনেক নারী কর্মস্থলে সূক্ষ্ম বৈষম্যের শিকার হন। তাদের দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বেশি প্রশ্ন করা হয়। মাতৃত্ব কিংবা সন্তান লালনপালনের দায়িত্বকে অনেক সময় পেশাগত অঙ্গীকারের ঘাটতি হিসেবে দেখা হয়। অথচ একই পরিস্থিতিতে পুরুষদের ক্ষেত্রে সামাজিক মূল্যায়ন ভিন্ন হয়।

নিখুঁত হওয়ার অদৃশ্য চাপ

সমাজ নারীদের সামনে এমন একটি আদর্শ দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তাকে একই সঙ্গে হতে হবে আদর্শ মা, আদর্শ স্ত্রী, দায়িত্বশীল পুত্রবধূ, সফল কর্মী এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানুষ।

বাস্তবে একজন মানুষের পক্ষে সব ক্ষেত্রে শতভাগ নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বহু নারী নিজের অজান্তেই এই অসম্ভব মানদণ্ড পূরণের চেষ্টা করেন।

ফলে কোনো একটি ক্ষেত্রে সামান্য ঘাটতি হলেই জন্ম নেয় অপরাধবোধ। অফিসে বেশি সময় দিলে মনে হয় সন্তানের প্রতি অবহেলা করছেন। আবার সন্তানের জন্য সময় দিলে মনে হয় কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়ছেন। এই দ্বন্দ্ব তাদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে।

নিজের জন্য সময় কোথায়

দিন শেষে তিনি যখন বিছানায় যান, তখনো পরদিনের পরিকল্পনা মাথায় ঘুরতে থাকে।

অনেক নারী বছরের পর বছর নিজের শখ, বই পড়া, ভ্রমণ, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, কিংবা নিছক বিশ্রামের সুযোগ পান না। ধীরে ধীরে তারা নিজের পরিচয়কেও হারিয়ে ফেলেন। একসময় তিনি আর শুধু একজন মানুষ নন; বরং দায়িত্বের ভারে ন্যুব্জ একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন।

সমাধান কোথায়

এই সমস্যার সমাধান নারীদের আরো শক্ত হওয়ার পরামর্শে নয়; বরং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনে। সংসার একজনের নয়; এটি সবার। রান্না, সন্তান লালন-পালন, বাজার করা কিংবা ঘরের কাজ—এসব দায়িত্ব ভাগাভাগি করা একটি সুস্থ পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হওয়া উচিত।

একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নমনীয় কর্মঘণ্টা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং বৈষম্যহীন কর্মসংস্কৃতি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

নিজের যত্নও জরুরি

একজন কর্মজীবী নারী যদি নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার দিকে নজর না দেন, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে তিনিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

তাই পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা গ্রহণ এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সুস্থ জীবনের অপরিহার্য অংশ। নিজেকে ভালো রাখা পরিবারকে ভালো রাখার পূর্বশর্ত।

একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের পরিচয় কেবল নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি নয়; বরং তার মানসিক সুস্থতা, মর্যাদা, বিশ্রাম এবং ব্যক্তিসত্তার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এক ভিসায় ঘোরা যাবে মধ্যপ্রাচ্যের ৬ দেশ

৯/১১ জাদুঘরে যুক্তরাষ্ট্রের শোকের প্রদর্শন, অনুপস্থিত প্রকৃত ইতিহাস

আত্মবিশ্বাসেই এগিয়ে যাচ্ছেন নারী চালকেরা

নিকলী হাওরে নৌকা বাইচ, দর্শনার্থীদের ঢল

মহাখালীতে একটি ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৩ ইউনিট

এক ভিসায় ঘোরা যাবে মধ্যপ্রাচ্যের ছয় দেশ

ঢাকায় বৃষ্টির আভাস, কমছে না ভ্যাপসা গরম

৭৮ বছর ধরে এক পরিবারই উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায়

হানিট্র্যাপে ফেলে শিক্ষককে জিম্মি, নারীসহ গ্রেপ্তার ৪

সুঁইয়ের ফোঁড়ে স্বপ্ন বুনছেন আত্মপ্রত্যয়ী ফাতেমা