নিজ হাতেই ড্রয়িং, আবার সে হাতের ছোঁয়ায়ই সুঁই-সুতার সাহায্যে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলছেন জীবন্ত ফুলের গাঁথুনি। আর এভাবেই পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে একটি নকশিকাঁথা। যেন সুঁইয়ের প্রতিটি ফোঁড়ে ফোঁড়ে সেলাই নয়, বরং বুনে যাচ্ছেন আত্মনির্ভরশীল হওয়ার নিখুঁত কোনো স্বপ্নকে।
কখনো রঙিন কাঁথা, কখনো বাহারি ডিজাইনের ব্লকের কাজ, সোফার কুশন-কভার, পাটের তৈরি দস্তর, ওয়ালম্যাটসহ নানা রকমের হস্তশিল্প তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন তজুমদ্দিনের চাঁদপুর ইউনিয়নের দেওয়ানপুর গ্রামের নারী উদ্যোক্তা ফাতেমা। এ পেশাকে বুকে আঁকড়ে ধরে স্বামী খোকনের টানাপোড়েনের সংসারের হাল ধরতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
আত্মপ্রত্যয়ী ফাতেমাকে দেখে উৎসাহিত হয়ে গ্রামের অন্য নারীরাও অংশ নিচ্ছেন সেলাইয়ের কাজে। আর তাদেরও সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। প্রাচীন এ সূচিশিল্পকে লালন করে স্বাবলম্বী হতে এগিয়ে আসছেন গ্রামের অসংখ্য নারী।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফাতেমার সঙ্গে ২০ জনেরও বেশি নারী সক্রিয় হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সুঁই-সুতার কারিগর ও আত্মনির্ভরশীল ফাতেমা বেগম আমার দেশকে জানান তার স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প। তিনি মেয়ে নুসরাত জাহান রূপা এবং স্বামী নুরনবী খোকনসহ পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নান্দনিক এ বুননের কাজে উৎসাহ ও সহযোগিতা পান বলে জানান। সেলাইয়ের এ আয় থেকে তিনি তৈরি করেছেন বসতঘর, চালাচ্ছেন সন্তানদের পড়ালেখার খরচও।
ফাতেমা বেগম বলেন, ৯০-এর দশকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় শখের বশে প্রথমে শুরু করি ড্রয়িংয়ের কাজ। পরে সেগুলোকে তুলির আঁচড়ে বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে তৈরি করি ছোট ছোট ওয়ালম্যাট। এরপর সেগুলো ৫ টাকা দরে সহপাঠীদের কাছে বিক্রি করি। সেই শখ থেকে শুরু করেন আঁকাজোঁকা আর সেলাইয়ের কাজ। গ্রামের দু-একজনকে বানিয়ে দেন নকশিকাঁথা। এভাবেই ধীরে ধীরে ফাতেমার হাতের সেলাই করা নকশিকাঁথার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে জেলার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ফাতেমা বলেন, আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে কাজের অর্ডার পাচ্ছি এবং সেগুলো কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছি। আর নিজ জেলার মধ্যে আমি নিজেই ডেলিভারি দিই।
একেকটি কাঁথার ড্রয়িংয়ের জন্য তিনি নেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। আর একটি পরিপূর্ণ কাঁথা তৈরি করে আয় করেন ৪-৫ হাজার টাকা। বর্তমানে কোনো কোনো সপ্তাহে ৩০-৩৫ হাজার টাকার কাঁথাসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পের মালামাল ডেলিভারি করে তার আয় হয় বলে জানান ফাতেমা।
আশপাশের প্রতিবেশী নারীশ্রমিকদের মধ্যে নাজমা বেগম, আয়েশা, অনু, রুমা, স্বপ্না, রিনা, আসমা, সাহিদা, রুবিনা, মুন্নি বেগমসহ ২০ জনেরও বেশি নারী ঘরে বসে ফাতেমার সঙ্গে সেলাইয়ের কাজ করে আয় করে আসছেন। পরে এটিকে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে গড়ে তোলেন ফাতেমা। ফাতেমা আরো বলেন, এখন কাজের অর্ডার পেলে তিনি ড্রয়িং করে দেন, এরপর অন্য নারীরা সেলাইয়ের কাজ করে থাকেন। কাজ শেষ হলে কাস্টমারদের কাছে পৌঁছে দেন কাঁথাসহ নানা হস্তশিল্প।
উপার্জনের জন্য এমন পথ বেছে নেওয়ায় খুশি তার পরিবার ও এলাকার মানুষ। অদম্য ইচ্ছা আর ধৈর্য থাকলে পর্দার মধ্যেও আয়ের পথ তৈরি করা যায় বলে মনে করছেন ফাতেমা।
ফাতেমার ভাসুরের মেয়ে ও আরেক নারী উদ্যোক্তা আয়েশা বেগম বলেন, ‘আমিও প্রথমে শখ থেকে হস্তশিল্পের কাজ করতাম। আঁকা, সেলাইসহ নানা ধরনের সৃজনশীল কাজ করতে ভালো লাগত। পরে কৌতূহল থেকে ফাতেমা বেগমের সঙ্গে কাজ করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারছি। আমরা কাঁথা ছাড়াও সোফার কুশন, কভারসহ নানা ধরনের সেলাইয়ের কাজ করে থাকি।’
এ শিল্পকে আরো বহুদূর এগিয়ে নেওয়ার আশা ব্যক্ত করেন তিনি। ঘরে বসে অলস সময় পার না করে টুকিটাকি সেলাইয়ের কাজ করে উপকৃত হওয়ার কথা বলেন অনু বেগম, স্বপ্না বেগম, রিনা বেগমসহ কয়েকজন। এই নারীদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব নাজমা বেগমও বলেন একই কথা।
স্থানীয় উদ্যোক্তা হাছনাইন লাহাড়ি বলেন, ‘ফাতেমার এমন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করায় তার পরিবারসহ এলাকার অর্ধশতাধিক নারীরও কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। এই পেশায় সম্পৃক্ত হয়ে পিছিয়ে পড়া নারীদের আত্মকর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে মনে করছেন তিনি।’
সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা ও ঋণ সহায়তা পেলে সূচিশিল্পের আরো প্রসার ঘটিয়ে নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চান এ নারী উদ্যোক্তা।
ঋণ সহায়তার পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তা ফাতেমা বেগমকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেওয়ার কথা বলেন তজুমদ্দিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. বনি আমিন।