নারীদের মধ্যে ডিম্বাশয়ের সিস্ট একটি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। অবশ্য অনেক সিস্ট ক্ষতিকর নয় এবং সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে কিছু সিস্ট ব্যথা, মাসিকের সমস্যা, প্রজনন জটিলতা কিংবা অন্য শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই সিস্ট সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি।
সিস্ট কী
ডিম্বাশয় বা শরীরের কোনো অংশে তরল বা অন্য উপাদানে ভরা থলির মতো গঠনকে সিস্ট বলা হয়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ডিম্বাশয়ে। জরায়ুমুখেও ন্যাবোথিয়ান সিস্ট হতে পারে। তবে সব সিস্ট ক্যানসার নয়। অধিকাংশ ডিম্বাশয়ের সিস্ট ক্যানসারবিহীন। অনেক সিস্ট চিকিৎসা ছাড়াই সেরে যায়।
কতটা সাধারণ
ডিম্বাশয়ের সিস্ট নারীদের মধ্যে বেশ সাধারণ। বিভিন্ন গবেষণায় বয়স ও পরীক্ষার পদ্ধতি অনুযায়ী হার ভিন্ন পাওয়া যায়। ৫৫ বছরের বেশি নারীদের একটি বড় গবেষণায় প্রথম আলট্রাসনোগ্রামে প্রায় ১৪ শতাংশের সাধারণ ডিম্বাশয়ের সিস্ট পাওয়া যায়। একই গবেষণায় এক বছর পর নতুন সাধারণ সিস্ট শনাক্ত হওয়ার হার ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে এন্ডোমেট্রিওসিসও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে প্রায় ১৯ কোটি নারী এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত।
প্রধান কারণ
১. হরমোনের পরিবর্তন : মাসিক চক্রে হরমোনের স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে ফাংশনাল সিস্ট তৈরি হতে পারে।
২. ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা: ডিম্বাণু বের হওয়ার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হলে সিস্ট হতে পারে।
৩. এন্ডোমেট্রিওসিস : ডিম্বাশয়ে এন্ডোমেট্রিওসিস হলে রক্ত জমে ‘চকলেট সিস্ট’ তৈরি হতে পারে।
৪. গর্ভাবস্থা : গর্ভধারণের শুরুতে কর্পাস লিউটিয়াম সিস্ট দেখা যেতে পারে।
৫. ডারময়েড সিস্ট : বিশেষ ধরনের টিস্যু দিয়ে এ ধরনের সিস্ট তৈরি হয়।
৬. পিসিওএস : পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে ডিম্বাশয়ে অনেক ছোট ফোলিকল দেখা যেতে পারে। তবে এগুলোকে সাধারণ সিস্টের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।
৭. পেলভিক সংক্রমণ : কিছু সংক্রমণ প্রজনন অঙ্গের আশপাশে জটিলতা তৈরি করে সিস্টজাতীয় গঠন সৃষ্টি করতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে
অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না। তবে সিস্ট বড় হলে দেখা দিতে পারে—তলপেটে ব্যথা, কোমরে ব্যথা, পেট ভারী লাগা, পেট ফাঁপা, মাসিক অনিয়ম, অতিরিক্ত মাসিক, মাসিকের সময় বেশি ব্যথা, পেলভিসে চাপ অনুভব, ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য, যৌনমিলনে ব্যথা, হাঁটা বা নড়াচড়ায় অস্বস্তি।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত—
হঠাৎ তীব্র তলপেটের ব্যথা, ব্যথার সঙ্গে বমি, মাথা ঘোরা বা দুর্বল হয়ে পড়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত, জ্বরের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, হঠাৎ পেটের ব্যথা দ্রুত বেড়ে যাওয়া। এসব ক্ষেত্রে সিস্ট ফেটে যাওয়া বা ডিম্বাশয় প্যাঁচিয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা বিবেচনা করা হয়।
সিস্টের প্রধান ধরন : ফাংশনাল সিস্ট মাসিক চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়।
* এন্ডোমেট্রিওমা : এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে তৈরি হয়। অনেক সময় তীব্র মাসিকের ব্যথা থাকে।
* ডারময়েড সিস্ট : বিশেষ ধরনের টিস্যু দিয়ে গঠিত। কিছু ক্ষেত্রে বড় হতে পারে।
* সিস্টাডেনোমা : ডিম্বাশয়ের বাইরের আবরণ থেকে তৈরি হতে পারে এবং বড় আকার ধারণ করতে পারে।
* ন্যাবোথিয়ান সিস্ট : জরায়ুমুখে দেখা যায়। সাধারণত ক্ষতিকর নয়।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়
* রোগীর উপসর্গ সম্পর্কে জানা হয়।
* মাসিকের ইতিহাস নেওয়া হয়।
* শারীরিক পরীক্ষা করা হতে পারে।
* আলট্রাসনোগ্রাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি।
* প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
* সন্দেহজনক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
চিকিৎসা কী
চিকিৎসা নির্ভর করে—
বয়স, সিস্টের আকার, সিস্টের ধরন, উপসর্গ, মেনোপজ হয়েছে কি না, আলট্রাসনোগ্রামের বৈশিষ্ট্য, সিস্ট বড় হচ্ছে কি না।
ছোট ও সাধারণ সিস্টের ক্ষেত্রে অনেক সময় শুধু পর্যবেক্ষণ করা হয়। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর আবার আলট্রাসনোগ্রাম করতে বলতে পারেন। বড়, দীর্ঘস্থায়ী, বারবার সমস্যা তৈরি করা বা সন্দেহজনক সিস্টের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
যা মনে রাখা জরুরি
সিস্ট মানেই ক্যানসার নয়। সব সিস্টের অস্ত্রোপচার লাগে না। আলট্রাসনোগ্রামে সিস্ট ধরা পড়লে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজে থেকে হরমোনের ওষুধ খাবেন না।
লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসার ধারণা : হোমিওপ্যাথিতে কোনো একটি নির্দিষ্ট ওষুধকে সব রোগীর জন্য উপযোগী বলে বিবেচনা করা হয় না। রোগীর ব্যক্তিগত উপসর্গ, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, মানসিক অবস্থা এবং রোগের সামগ্রিক চিত্র বিবেচনা করে ওষুধ নির্বাচনের কথা বলা হয়। বিভিন্ন হোমিওপ্যাথিক গ্রন্থে নারী প্রজনন অঙ্গের বিভিন্ন উপসর্গের সঙ্গে যেসব ওষুধের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছেÑসেপিয়া, ক্যালকেরিয়া কার্বোনিকা, থুজা অক্সিডেন্টালিস, কনিয়াম ম্যাকুলেটাম, সাবিনা, ফ্র্যাক্সিনাস আমেরিকানা, ট্রিলিয়াম পেন্ডুলাম, ক্যালি কার্বোনিকাম, লাইকোপোডিয়াম, ফসফরাস, বেলাডোনা, ল্যাকেসিস, অরাম মিউরিয়াটিকাম ন্যাট্রোনাটাম, প্লাটিনা, হেলোনিয়াস ডায়োইকা, হ্যামামেলিস ভার্জিনিকা, ক্যালকেরিয়া ফ্লুরিকা, গ্রাফাইটিস, ন্যাট্রাম মিউরিয়াটিকাম, আর্সেনিকাম অ্যালবাম, সিলিসিয়া, কার্বো ভেজিটাবিলিস, ইগ্নেশিয়া, পালসাটিলা, নাক্স ভোমিকা, চায়না অফিশিনালিস, ম্যাগনেশিয়া ফসফোরিকা, কস্টিকাম, ক্রিয়োজোটাম, আয়োডাম, ফাইটোলাক্কা ও রাস টক্সিকোডেনড্রন।
তবে এসব ওষধ নিজে নিজে ব্যবহার না করে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
পরিশেষে বলা যায়, ডিম্বাশয়ের সিস্ট নারীদের একটি সাধারণ সমস্যা হলেও সব সিস্টের আচরণ এক নয়। তাই ‘সিস্ট হয়েছে’—এই তথ্যের চেয়ে সিস্টটি কী ধরনের, কত বড় এবং কী পরিবর্তন করছে—এসব জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শই পারে অযথা ভয় কমাতে এবং সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতে।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক