নীরবতার কোলে মাথা রেখে একে একে ঘুমিয়ে পড়েছে পৃথিবীর সব মানুষ। লাগামহীন পাখিগুলোও আজ নীরব, নিস্তব্ধ। চারপাশে গভীর প্রশান্তি। অথচ জেগে আছে আরবের প্রকৃতি। সেজে উঠেছে আরবের মরুপ্রান্তর। মাথার উপর ডানা মেলে থাকা আকাশ আজ যেন অদ্ভুত এক রূপ ধারণ করেছে। চাঁদ মেতে উঠেছে আকাশের সঙ্গে কোনো এক গোপন সংলাপে। শতসহস্র মাইল দূরের তারাগুলোও যেন নিঃসঙ্গতার বিষাদ ভুলে আনন্দে ঝলমল করছে। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর দিকে একটু ঝুঁকে না এলে আজকের এই আনন্দের সাক্ষী হওয়া যাবে না। বাতাসের বুকে ভর করে কী এক মোহনীয় সুর উড়ে বেড়াচ্ছে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে। কী যেন ঘটতে যাচ্ছে! কীসের যেন আলামত পৃথিবীর প্রাণে প্রাণে অদৃশ্য গান হয়ে বাজছে। মক্কা তখনো জানে না, ইতিহাসের কোন মহামুহূর্ত তার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবী তখনো জানে না, এমন একজন মানুষ আসছেন, যার নাম উচ্চারিত হবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। যার জীবন বদলে দেবে মানুষের চিন্তা, সমাজ, সভ্যতা ও ইতিহাসের গতিপথ। তিনি আসছেন। রহমতের নবী। মানবতার শিক্ষক। আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল, মুহাম্মদ ﷺ।
শিশু মুহাম্মদ ﷺ-এর জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অপূর্ব নূরের বর্ণনা। তার মা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি এমন এক নূর দেখেছিলেন, যার আলোয় শামের প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়ে উঠেছিল। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের সময় তাঁর মা এমন এক নূর দেখেছিলেন, যার দ্বারা শামের প্রাসাদ আলোকিত হয়েছিল। আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেই তাঁর মায়ের সেই স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর মা তাঁকে গর্ভে ধারণ করার সময় এমন একটি নূর দেখেছিলেন, যার আলোয় শামের বুসরার প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়েছিল। কী আশ্চর্য! একটি শিশু তখনো মায়ের গর্ভে। কিন্তু তাঁর আগমনের নূর যেন মক্কার সীমানা পেরিয়ে বহু দূরের শামের দিকে ইশারা করছে। এ যেন অন্ধকার পৃথিবীর সামনে আলোর একটি প্রথম সংবাদ। শুধু একটি ঘর নয়, শুধু একটি নগর নয়, একটি নূর যেন ভবিষ্যতের এক বিশাল দিগন্তকে আলোকিত করার ঘোষণা নিয়ে এসেছে। কাজী নজরুল ইসলামের কল্পনায় সেই দৃশ্য হয়ে উঠেছে আরো মায়াময় : ‘যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে, তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে।’ সত্যিই তো! আমিনার কোলে তখন শুধু একটি শিশু নয়। সেই কোলে যেন ভবিষ্যতের এক নতুন ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে।
শেষ রাতের দিকে খুলে গেল রহস্যের জট। পৃথিবীর ইতিহাসে উদিত হলো এক নতুন ভোর। আমিনার কোল আলো করে জন্ম নিলেন এক আশ্চর্য সুন্দর মানবশিশু। তাঁর মুখ যেন পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল। তাঁর ছোট্ট শরীর যেন সদ্য ফোটা ফুলের মতো কোমল ও পবিত্র। তিনি মুহাম্মদ ﷺ। এক মায়ের কোল আলো করে জন্ম নিলেন এমন এক শিশু, যাঁর আগমন পরবর্তীকালে বদলে দেবে মানুষের ইতিহাস। যে সময় আরবের সমাজ ডুবে ছিল অজ্ঞতা, শিরক, গোত্রবাদ, জুলুম ও নৈতিক অবক্ষয়ের অন্ধকারে, সে সময়েই জন্ম নিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের জন্য হেদায়াতের দ্বার উন্মুক্ত করবেন। কোরআন তাঁকে বলেছেন, ‘সমস্ত জগতের জন্য রহমত।’ তাই তাঁর আগমন শুধু একটি শিশুর জন্ম নয়। এটি ছিল রহমতের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
মা আমিনার ঝিমিয়ে পড়া জীবনে যেন নতুন ছন্দ ফিরে এলো। অশ্রু ঝাপসা চোখের আলো যেন আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বেঁচে থেকেও এতদিন তিনি যেন মৃত্যুর কালো চাদর মুড়ি দিয়ে ছিলেন। স্বামীর মৃত্যু তার জীবন থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল অনেক স্বপ্ন, অনেক রঙ। কিন্তু আজ তাঁর কোল আলো করা এই শিশুর আগমনে জীবনের সঙ্গে তাঁর যেন নতুন এক যোগসূত্র তৈরি হলো। যে দিনগুলো ছিল বেদনার, সেগুলোতে এলো আনন্দের স্পর্শ। যে রাতগুলো ছিল দীর্ঘ ও বিষণ্ণ, সেগুলোতে নেমে এলো প্রশান্তি। তৃষ্ণার্ত চোখে মা আমিনা বারবার তাঁর শিশুকে দেখেন। যত দেখেন, ততই যেন দেখার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে। শিশুটির বিস্ময়ভরা চাহনি মায়ের মনে কত যে স্বপ্ন জাগায়! মনে হয়, এই শান্তিদূতের জন্য তাঁর সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দেন। বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সব মমতা ঢেলে দেন তাঁর কোমল শিশুটির ওপর। প্রতিবেশিনীরা দলে দলে আসতে শুরু করল শিশুটিকে দেখতে। তাদের বিস্মিত চোখ শিশুর মুখে স্থির হয়ে থাকে। তাঁর সৌন্দর্য দেখে তারা মুগ্ধ হয়। বাছা আমার, সাত রাজার ধন! মুখের লালা যেন মধুর মতো মিষ্টি। অবাক চাহনিতে এমন এক আকর্ষণ, যা দেখলে মন আপনা-আপনি তাঁর দিকে টেনে যায়। এই তো সেই শিশু আহমদ! যাঁর আগমনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নূরের সেই বিস্ময়কর সংবাদ।
নবীজি ﷺ-এর জন্মের সঙ্গে আরো কিছু বিস্ময়কর ঘটনার কথা সিরাত ও দালায়িলের বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো পারস্যের সম্রাট কিসরার প্রাসাদ বা ইওয়ানের কেঁপে ওঠা এবং তার চৌদ্দটি বারান্দা বা শরফত ভেঙে পড়ার ঘটনা। একই বর্ণনায় বলা হয়েছে, পারস্যের অগ্নিমন্দিরে দীর্ঘদিন ধরে জ্বলতে থাকা আগুন নিভে গিয়েছিল। সাওয়া হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার কথাও সেখানে এসেছে। আরো এসেছে কিসরার দরবারে দেখা এক অদ্ভুত স্বপ্নের কথা, যেখানে আরবের উট ও অশ্বদের দজলা নদী অতিক্রম করার দৃশ্য দেখা হয়েছিল। ঘটনাগুলো যেন একে একে একটি নতুন যুগের আগমনের বার্তা বহন করছিল। পারস্যের অগ্নিমন্দিরের আগুন, কিসরার প্রাসাদের কম্পন, সাওয়া হ্রদের শুকিয়ে যাওয়া, আরবের মরুপ্রান্তরে জন্ম নেওয়া এক শিশু। সবকিছু মিলিয়ে যেন ইতিহাসের মঞ্চে নতুন কোনো অধ্যায়ের পর্দা উঠছিল। প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, নবীজি ﷺ-এর জন্মরাতে পারস্যের একটি অগ্নিমন্দিরের আগুন নিভে গিয়েছিল। পারস্যের অগ্নিপূজার ঐতিহ্যে আগুন ছিল বিশেষ মর্যাদার প্রতীক। তাই এ ঘটনার মধ্যে অনেকে দেখেছেন, অন্ধকারের যুগ পেরিয়ে তাওহিদের আলো পৃথিবীতে উদিত হওয়ার এক প্রতীকী ইঙ্গিত। সাওয়া হ্রদের কাহিনিও নবীজি ﷺ-এর জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বলা হয়, সেই রাতে হ্রদের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। আর কিসরার প্রাসাদের চৌদ্দটি শরফত ভেঙে পড়ার ঘটনাটিও ইতিহাসের নানা বর্ণনায় এসেছে। যেন পুরোনো পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল নতুন এক পৃথিবীর আগমনে।
কিন্তু এই নূর আসলে কীসের নূর? শুধু কি আকাশ আলোকিত করা কোনো আলো? শুধু কি কোনো প্রাসাদ আলোকিত করার আলো? না। তাঁর আগমনের সবচেয়ে বড় আলো ছিল হেদায়াতের আলো। কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে এক নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব।’ এই নূর মানুষের চোখের জন্য নয়, হৃদয়ের জন্য। এই আলো অন্ধকার ঘরকে নয়, অন্ধকার হৃদয়কে আলোকিত করে। এই আলো কোনো প্রাসাদের দেয়ালে আটকে থাকে না। এটি ছড়িয়ে পড়ে মানুষের বিশ্বাসে, চরিত্রে, জীবনে। মক্কার সেই ছোট্ট ঘর থেকে যে আলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ছড়িয়ে পড়ে মক্কা থেকে মদিনা, মদিনা থেকে আরব, আরব থেকে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে। একসময় যে মানুষ নিজের কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দিত, সেই মানুষই তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করে এত কোমল হয়ে উঠল যে, একটি পাখির ছানার কষ্ট নিয়েও চিন্তিত হতে শিখল। যে গোত্রগুলো সামান্য কারণে বছরের পর বছর যুদ্ধ করত, তারা তাঁর শিক্ষায় ভাই ভাই হয়ে গেল। যে সমাজে শক্তিই ছিল ন্যায়ের মাপকাঠি, সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন মানুষের মর্যাদা। যে পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে ছিল, সেখানে তিনি নিয়ে এলেন তাওহিদের আলো। সুতরাং তাঁর জন্মের সবচেয়ে বড় অলৌকিক নিদর্শন শুধু কোনো প্রাসাদ কেঁপে ওঠা নয়। সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো, একজন মানুষ এলেন এবং তাঁর মাধ্যমে একটি জাতি বদলে গেল। একটি জাতি বদলে গেল, আর ইতিহাস বদলে গেল। ইতিহাস বদলে গেল, আর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের পথ বদলে গেল।
নবীজি ﷺ-এর আগমনকে কবি একটি ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সাহারার বুকে ফুটে ওঠা এক অপূর্ব ফুল। যে ফুলের রং শুধু একটি বাগানকে সুন্দর করেনি। যে ফুলের সুবাস শুধু একটি জনপদে ছড়ায়নি। বরং তার সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে যুগ থেকে যুগান্তরে। কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে সেই অনুভূতি হয়ে উঠেছে : ‘সাহারাতে ফুটল রে, রঙিন গুলে-লালা, সেই ফুলেরই খোশবুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা। সে ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি চাঁদ-সূর্য গ্রহ-তারায়, ঝুঁকে পড়ে চুমে সে ফুল নীল গগন নিরালা। সেই ফুলেরই রওশনিতে আরশ-কুরসি রওশন, সেই ফুলেরই রঙ লেগে আজ ত্রিভুবন উজালা।’ কবির ভাষা ভালোবাসার ভাষা। আর ইতিহাসের ভাষা আমাদের বলে, এই নবজাতকই একদিন আরবের বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে ঈমানের বন্ধনে একত্র করবেন। অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে থাকা মানুষকে তাওহিদের দিকে ডাকবেন। জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবেন। আর তাঁর হাতে পৌঁছে যাবে আল্লাহর শেষ ওহি। তাই তাঁর জন্মের রাতের সবচেয়ে বড় আলো শুধু আকাশে দেখা কোনো নূর নয়। সবচেয়ে বড় আলো ছিল সেই হেদায়াত, যা তাঁর মাধ্যমে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই আলো আজও নিভে যায়নি। মক্কার সেই ছোট্ট ঘর থেকে যে আলো যাত্রা শুরু করেছিল, তা আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে জ্বলছে। সেই আলো কোনো প্রাসাদের দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো মরুভূমির বালুতেও সীমাবদ্ধ নয়। কোনো একটি জাতির জন্যও নয়। এটি মানুষের হৃদয়ের আলো। আর সেই আলোর বাহক ছিলেন মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ। একটি ফুল ফুটেছিল আরবের মরুভূমিতে। কিন্তু তার সুবাসে মাতোয়ারা হয়েছিল জাহান। সেই ফুলের নাম, মুহাম্মদ ﷺ।