কলেজজীবনে অ্যান্ড্রয়েড ফোন হাতে ছোট ছোট ভিডিও বানানোর মধ্য দিয়েই কনটেন্ট তৈরির শুরু বিন ইয়ামিনের। ফোন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় থেমে যায় সেই যাত্রা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রায় এক বছর পর আবারও শর্টস ও ট্রেন্ডিং রিলস বানানো শুরু করেন তিনি। এরপর নতুন ফোন, নতুন পেজ আর নতুন স্বপ্ন—সঙ্গী হন তানভীর, রাজু ও রাফি।
নানা ব্যস্ততায় একসময় তানভীর ও রাফি সরে গেলেও থেমে থাকেননি ইয়ামিন ও রাজু। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন স্বাধীন। ধীরে ধীরে পেজটি পৌঁছে যায় ৩০ হাজার ফলোয়ারে। কিন্তু স্বাধীন ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেলে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ঠিক সেই সময় সাব্বির, রেজওয়ান ও সীমান্তের আগমন বদলে দেয় পুরো গল্প।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী বিন ইয়ামিনের কনটেন্ট তৈরির যাত্রাটা এমনই ওঠানামায় ভরা। আজ সেই পথ পেরিয়ে ক্লাসমেট পাঁচ বন্ধুকে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন ১২ লাখ ফলোয়ারের ফেসবুক পেজ ‘ইয়ারাতা’। বন্ধুদের আড্ডা, নানা দুষ্টুমি আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজীবনের ছোট-বড় গল্পই তাদের কনটেন্টের মূল উপজীব্য।
একটি ভিডিওর পেছনে যত আয়োজন
টিম ইয়ারাতার ভিডিও দেখে দর্শক কয়েক মিনিট হাসলেও সেই হাসির পেছনে থাকে দীর্ঘ সময়ের চিন্তা, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম। দলের মূল আইডিয়া ও স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন বিন ইয়ামিন। শুটিংয়ের প্রতিটি শটের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ভিডিও এডিটিং—সবকিছুতেই থাকে তার সরাসরি ভূমিকা। আর দলের অন্য সদস্যরা ক্যামেরা সামলানোর পাশাপাশি নিজেদের স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়দক্ষতায় চরিত্রগুলোকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। শুটিংয়ের সময় সংলাপ ভুলে যাওয়া, একই দৃশ্য বারবার ধারণ করা, কিংবা কোনো একটি দৃশ্য ঠিকঠাক না হওয়া—এসব তাদের কাছে বিরক্তির নয়, বরং আনন্দেরই অংশ। একেকটি ভিডিও তৈরির সময় এমন অসংখ্য ছোট ছোট ভুল, হাসিঠাট্টা আর আড্ডার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় ইয়ারাতার কনটেন্ট। শেষ পর্যন্ত সেই পরিশ্রমের ফলই কয়েক মিনিটের হাসির ভিডিও হয়ে পৌঁছে যায় লাখো দর্শকের কাছে।
বিন ইয়ামিন বলেন, কনটেন্টের আইডিয়া বেশি বেশি ভাবনা ও চিন্তা থেকেই আসে। এরপর স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী কে কোন চরিত্রে ভালো করবে, সেটা ঠিক করি। বাস্তব জীবনে বন্ধুরা যেমন, তাদের সেই স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বই চরিত্রে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি।
চাকসু নির্বাচন মোড় বদলে দেয় ইয়ারাতার
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন যেন টিম ইয়ারাতার জন্য হয়ে আসে বড় টার্নিং পয়েন্ট। নির্বাচন ঘিরে একের পর এক ভিডিও বানাতে শুরু করে দলটি। এরপর শুরু হয় ভাইরাল হওয়ার ঢেউ। টানা কয়েকটি ভিডিও মিলিয়ন ভিউ পেতে থাকে, দ্রুত বাড়তে থাকে ফলোয়ার। নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ভোট না পাওয়ার মজার গল্প কিংবা অলিগলিতে ভোট চাওয়ার দৃশ্য—এসব কনটেন্ট তাদের পরিচিতি এনে দেয় ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে বৃহত্তর দর্শকের কাছে।
এর আগেও তাদের একটি ‘আব্বারে কে মারছে’ ধরনের ভিডিও মিলিয়ন হিট করেছিল। পড়াশোনা নিয়ে অনুপম রায়ের গানের সুরে বানানো একটি মজার গান আবার প্রথম ১০ মিলিয়ন ভিউয়ের মাইলফলক ছুঁয়ে দেয়। এরপর ৩৫-৪০ মিলিয়ন ভিউ পাওয়া ভিডিওও আসে তাদের ঝুলিতে।
ইয়ারাতাকে ঘিরে তাদের স্বপ্ন
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে চান ‘ইয়ারাতা’ টিমের সদস্যরা। তবে কনটেন্ট তৈরির প্রতি ভালোবাসা থেকে এটিকে ভবিষ্যতে পেশা হিসেবে নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা। তাদের স্বপ্ন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ইয়ারাতার অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোডাকশন হাউস গড়ে তোলা, যেখানে কমেডি কনটেন্টের পাশাপাশি নির্মিত হবে বাণিজ্যিক সিনেমাও।
দর্শকদের প্রতি যে বার্তা
দর্শকদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানিয়েছেন টিম ইয়ারাতার সদস্যরা। দর্শকদের উদ্দেশে তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় না দিয়ে পড়াশোনা ও নিজের ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। কারণ দর্শকদের সামনে যে দু-তিন মিনিটের হাসির মুহূর্ত দেখা যায়, তার পেছনে থাকে ইয়ারাতা সদস্যদের ক্লাস, কাজ, ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও নানা ব্যস্ততা। সবকিছুর শেষে সেই ব্যস্ততার ফাঁকে সময় বের করেই তৈরি হয় একটি ভিডিও।