সরকারি চাকরির সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিলের দাবিতে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ১০ জুলাই সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক ‘ব্লকেড’ কর্মসূচি পালিত হয়। এর জেরে রেলপথ, সড়ক ও মহাসড়ক অচল হয়ে পড়লে সারা দেশ থেকে রাজধানী কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সরকারি চাকরির ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত কোটার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শেষে আপিল বিভাগ এদিন স্থিতাবস্থার আদেশ দেয়। তবে তাতেও আন্দোলন দমেনি; বরং নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ১০ জুলাইর বাংলা ব্লকেড কর্মসূচিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা অবরোধে অংশ নেন। সেদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়, যা চলে পৌনে ৮টা পর্যন্ত। কেন্দ্রীয়ভাবে শাহবাগে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে এ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব মোড়, কাঁটাবন, নীলক্ষেত, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, মহাখালী, চানখাঁরপুল, মৎস্য ভবন, জিপিও, রামপুরা ব্রিজ, আগারগাঁও, হাতিরঝিল মোড়, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ১৮ পয়েন্টে অবরোধ করায় রাজধানী কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
এমনকি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফার্মগেট অংশে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে যাত্রীর চাপ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় মেট্রোরেলের সচিবালয়, মতিঝিলসহ বিভিন্ন স্টেশনের প্রবেশ ফটকে তালা দেয় কর্তৃপক্ষ। অবরোধের মধ্যে গাড়ি নিয়ে আটকা পড়লে সিএনজি অটোরিকশায় চেপে সংসদে যান ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি। তিনি জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ঢাকার বাইরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী, সাভার, গোপালগঞ্জ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, পাবনা, দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, পটুয়াখালীসহ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের একাধিক স্থানে শিক্ষার্থীরা অবরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
একই দিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ সাতটি স্থানে রেলপথ অবরোধ করা হয়। ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ দুপুর ১২টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। অন্তত ২২টি ট্রেনের রাজধানীতে ফিরতে এবং ফিরতি যাত্রা বিলম্বিত হয়।
১০ জুলাই সন্ধ্যা নাগাদ কিছু জায়গায় অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যা ৭টায় জিরো পয়েন্ট ছাড়ে। শাহবাগ মোড় থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয় রাত পৌনে ৮টার দিকে।
উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশ
সরকারি চাকরির ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত কোটার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শেষে ১০ জুলাই স্থিতাবস্থার আদেশ দেয় আপিল বিভাগ। এতে কোটা ব্যবস্থা পূর্বাবস্থায় থেকে যায়, অর্থাৎ ওই পাঁচটি গ্রেডে কোটা থাকবে না। এ আদেশের মাধ্যমে আদালত আশা প্রকাশ করে, শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাবে এবং আন্দোলনের বক্তব্য আইনজীবীদের মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপন করবে।
এদিকে সরকারি চাকরির কোটা প্রশ্নে হাইকোর্টের রায়ের ওপর সর্বোচ্চ আদালতের চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থার ঘোষণার পরও রাজপথ ছাড়ছেন না বলে জানিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। তারা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের কাছে ত্রুটিহীন পরিপত্রের দাবি জানিয়ে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
নতুন কর্মসূচি ঘোষণা
আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ও সারজিস আলম ১০ জুলাই শাহবাগের সমাবেশে জানান, সরকারের কাছে তাদের একমাত্র দাবি হলো সব গ্রেডে কোটা বাতিল করে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ কোটার সীমা রেখে সংসদে আইন পাস করতে হবে। তারা ১১ জুলাই বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে সারা দেশে নতুন করে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।
সারজিস আলম বলেন, আমাদের দাবি আদালতের কাছে নয়, সরকারের কাছে। আদালত পরিপত্র নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু পরিপত্র বাতিল বা জারি করার একমাত্র অধিকার সরকারের। যদি নির্বাহী বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ এটি ঘোষণা করে অথবা নির্বাহী বিভাগ আদেশ জারি করে কিংবা ত্রুটিহীন পরিপত্র জারি হয়, তাহলে আমাদের আর রাজপথে দেখা যাবে না।
এদিকে কোটার বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে উল্লেখ করে সে পর্যন্ত ‘দুর্ভোগ সৃষ্টির কর্মসূচি’ বন্ধ করার আহ্বান জানান ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ১০ জুলাই ধানমন্ডিতে দলের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আদালত (আপিল বিভাগ) কোটা সংস্কার নিয়ে চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা জারি করেছে। আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আশা করি আদালত বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেবে।