ফিরে দেখা জুলাই বিপ্লব
সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার হলেও কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের ১২ জুলাই রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাস ছিল বিক্ষোভে উত্তাল। এক দফা দাবিতে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভের একপর্যায়ে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। এতে যোগ দেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরাও। তারা আগের দিন কুমিল্লা, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা, টিয়ার গ্যাসের শেল ও গুলিবর্ষণ এবং ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলন ঘিরে পুলিশ আগে থেকেই শাহবাগের মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে ব্যারিকেড তৈরি করে। এদিন আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা না করলেও পুলিশের সামনে গিয়ে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেয়।
শিক্ষার্থীরা বলেন, বাধা যতই আসুক, সংসদে আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। তাদের এক দফা ছিল—সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে শুধু পিছিয়ে পড়া বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম কোটা (সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ) রেখে এ ব্যবস্থা সংস্কার করে আইন পাস করতে হবে।
সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আমাদের কতদিন রাস্তায় দেখতে চায়, কতদিন প্রহসনের সিদ্ধান্তের মধ্যে রাখবে—এটি সরকারই নির্ধারণ করুক। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার দায় সরকারকে নিতে হবে। আমাদের হারানোর কিছু নেই। আমরা একটি চাকরির নিশ্চয়তা চাই; কোটা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।
আরেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার জানান, ১৩ জুলাই সারা দেশে অনলাইন-অফলাইনে প্রতিনিধি বৈঠক করা হবে। এর পর সন্ধ্যা ৬টায় সংবাদ সম্মেলনে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যারা ষড়যন্ত্র করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল, সেই প্রেতাত্মারা যে এ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত নয়—তা আমি অস্বীকার করতে পারব না। সরকারের দায়িত্ব জনগণের জানমাল রক্ষা করা। সুবিধা-অসুবিধা দেখা। এটি কেউ বাধাগ্রস্ত করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আমার বিশ্বাস, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ মেনে ঘরে ফিরে যাবে।
এক অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, আদালতের প্রতি সবার আস্থা রাখা ও শ্রদ্ধা-সম্মান থাকা উচিত। কোটা আন্দোলনের নামে কেউ আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মিছিল কলাভবনের সামনে থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে বাহাদুরশাহ পার্ক, কবি নজরুল কলেজ হয়ে আবার ক্যাম্পাসে গিয়ে শেষ হয়। বিক্ষোভ মিছিল থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা। দেশের কয়েকটি স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মশাল মিছিল করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মশাল মিছিল করেন।
মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ ছাত্রলীগের ক্যাডারদের বাধায় শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করতে পারেননি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রাজশাহী রেললাইন অবরোধ করেন। এতে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এবং রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম নগরীজুড়ে লংমার্চ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এ সময় পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও চকবাজার এলাকায় অবস্থানরত পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে তারা দুয়ো ধ্বনি দেয়।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরের সড়কে অবস্থান নিতে গেলে তাদের পুলিশি বাধায় আটকে দেওয়া হয়। পরে তারা ফটকে অবস্থান নেয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়ক এবং ভিসির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন সেখানকার শিক্ষার্থীরা। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আন্দোলনে বাধা দেওয়ার সময় ভিডিও ধারণ করায় এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা।
ময়মনসিংহে আনন্দ মোহন কলেজ, নাসিরাবাদ কলেজ, মুমিনুন্নেছা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা বিক্ষোভ করে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে। গোপালগঞ্জের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নীলফামারীর সৈয়দপুর, বগুড়া এবং নোয়াখালীর মাইজদীতেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে।
এদিকে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার জন্য বরাদ্দ ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন জুম্ম শিক্ষার্থীরা। ঢাকার জুম্ম শিক্ষার্থীদের ব্যানারে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ কর্মসূচি পালিত হয়।