তাহমিনা খাতুনের ‘পাণ্ডুর চাঁদ’
বাংলা কাব্যজগতে নতুন কণ্ঠস্বরের আবির্ভাব সবসময়ই এক নতুন আশার জন্ম দেয়। সেই নতুন সুরটি যদি হয় মাটি, মানুষ, প্রেম, সময় ও আত্মার সম্মিলনে নির্মিত, তবে সেটি শুধু কাব্যের নয়, জীবনবোধেরও একটি দিগন্ত হয়ে ওঠে। কবি ও কথাসাহিত্যিক তাহমিনা খাতুনের কাব্যগ্রন্থ ‘পাণ্ডুর চাঁদ’ এমনই এক কাব্যভুবন, যেখানে কবিতা হয়ে উঠেছে একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতি, সামাজিক চেতনা, প্রকৃতির অনুভব ও মানবিক প্রতিফলনের সংমিশ্রণ।
‘পাণ্ডুর চাঁদ’ নামটিই যেন কবির কাব্যচেতনার প্রতীক। চাঁদ এখানে শুধু আলো নয়, বিবর্ণতা, শূন্যতা, সময়ের পাণ্ডুর রূপও। একদিকে স্মৃতির ধূসর চাঁদ, অন্যদিকে আত্মার ব্যথার আলোকরেখা—এই দ্বৈত রূপই তাহমিনা খাতুনের কবিতার কেন্দ্রীয় প্রতীক। তার কবিতায় চাঁদ, নদী, মাটি, গাছ, ফুল, পাখি, সময়—সবই যেন জীবন্ত চরিত্র, যা পাঠককে নিয়ে যায় এক আত্মিক সংলাপে। তার কবিতার বুনন সরল অথচ গভীর, যেন পরিচিত রূপকেই নতুন চোখে দেখা।
প্রথম কবিতা ‘সাধ জাগে মনে’ প্রেম ও বিয়োগের মিশ্র অনুভূতির এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর পরও সেই স্মৃতির আলোকচ্ছটায় কবি বেঁচে থাকেন, যেন মৃত্যু ও জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনন্ত এক সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘রাতের রূপ’ কবিতায় নিস্তব্ধতার ভেতর সময়ের ছায়া ও প্রকৃতির মনস্তত্ত্ব ধরা পড়ে। ‘আমার গ্রাম’ কবিতাটি তাহমিনা খাতুনের নস্টালজিক কবিসত্তার সর্বোচ্চ প্রকাশ। তিনি স্মৃতির আয়নায় ফিরে যান তার জন্মস্থান দ্বারিয়াপুর গ্রামের বুকের দিকে। কবিতার প্রতিটি চিত্র যেন তার শিশুকালের দিনলিপি।
‘মায়া মরীচিকা’ কবিতায় তিনি সময় ও জীবনের দার্শনিক রূপ নিয়ে ভাবনা প্রকাশ করেন। ‘জীবন সে তো এক মস্ত মরীচিকা’—এই উচ্চারণে আছে জীবনের অসারতা, মানুষের অনন্ত খোঁজ এবং আত্ম-অভ্যন্তরের প্রশ্ন। এটি একান্তই ভাবনামূলক কবিতা, যেখানে তিনি শূন্যতা ও আলোর দ্বন্দ্বকে একত্রে স্থাপন করেছেন। ভাবনার পরিসর যত প্রসারিত হয়েছে, ততই তার কবিতার ভাষা হয়েছে বিমূর্ত।
তাহমিনা খাতুনের কবিতার শক্তিশালী দিক হলো ইতিহাস ও দেশপ্রেমের বোধ। ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি ভাষা শহীদদের প্রতি’, ‘কাল রাতের খাম’, ‘বিজয় দিবস’—এই তিনটি কবিতায় তিনি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করেছেন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে।
‘তিতাস নদীর পাড়ে’ কবিতায় কবি জীবনের মাটির ঘ্রাণে ফিরে যান, যেন এক চিরন্তন যাত্রা শুরু হয় গ্রামের নদীতীরে। তিতাসের বুক চিরে নৌকা, গাঙচিল, কৃষক, রাখাল—সব মিলিয়ে এখানে প্রকৃতি ও মানুষের এক নিঃসঙ্গ সহাবস্থান ধরা পড়ে। এই কবিতা পাঠককে নিয়ে যায় এক ধীর, শান্ত ও মমতাময় বাস্তবতায়। নগরজীবনের বিরুদ্ধচিত্র হিসেবে এটি এক শিকড়মুখী যাত্রা, যেখানে প্রকৃতি জীবনের সমান্তরাল প্রতীক।
‘ফিরে যাই আপন কুটিরে’ ও ‘মাটির টান’ কবিতায় তিনি যেন এই ফেরার প্রক্রিয়াকে পূর্ণতা দেন। শহরের ক্লান্তি ও সময়ের প্রলোভন শেষে তিনি ফিরে যেতে চান নিজের মাটিতে, নিজের ঘ্রাণে। এই মাটির টান শুধু ভৌগোলিক নয়, অস্তিত্বগত। এখানে কবি একান্তে ঘোষণা করেন নিজের মাটিমিশ্র আত্মপরিচয়।
তাহমিনা খাতুনের কবিতায় নারীসত্তা ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান এক বিশেষ মাত্রা লাভ করেছে ‘মানবী’ কবিতায়। এখানে নারী কেবল পিতা, পতি বা পুত্রের আশ্রয়ে বেঁচে থাকা একটি সামাজিক প্রতীক নয়; বরং সে নিজেকে চিনতে চায়, পরিচয় পুনর্নির্মাণ করতে চায়।
একইভাবে ‘আত্মার আর্তনাদ’ কবিতাটি সমকালীন সভ্যতার বিপরীতে মানুষের আত্মবোধের বিশ্লেষণ। এখানে কবি কেবল পরিবেশদূষণ, প্রযুক্তিনির্ভরতা বা সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেননি; বরং তিনি এক গভীর অস্তিত্ববাদী সংকট তুলে ধরেছেন। ‘হে মানুষ, শুনতে কি পাও তোমার আত্মার আর্তনাদ’—এই আহ্বান একবিংশ শতকের নৈতিক নিস্তব্ধতার মুখে ধ্বনিত হয়। এটি যেন এক ধ্যানগম্ভীর ধর্মগ্রন্থের মতো কাব্যিক উচ্চারণ, যা পাঠককে আত্মসমালোচনায় নিমজ্জিত করে।
তাহমিনা খাতুনের কবিতায় প্রকৃতি কেবল বাহ্য রূপ নয়, আত্মার অবলম্বন। ‘রজনীগন্ধার রূপ’ কবিতায় তিনি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের Daffodils-এর ছায়ায় এক নতুন অভিব্যক্তি সৃষ্টি করেছেন। রজনীগন্ধার ফুলের সাদা পাপড়ি যেন জীবনের নির্মলতা ও একাকিত্বের প্রতীক। ‘পুষ্প তো নয় বুঝি অযুত তারা/দূর থেকে করে শুধু হাত ইশারা’—এই পঙ্ক্তিগুলোতে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সংলাপ ধরা পড়ে। এখানেই তার কবিতার গভীরতম সৌন্দর্য: প্রকৃতি হয়ে ওঠে আত্মপ্রকাশের ভাষা।
‘অচেনা সুর’ কবিতায় তিনি আবার ফিরে গেছেন ওয়র্ডসওয়ার্থের ‘The Solitary Reaper’-এর ভাবনাজগতে, কিন্তু নিজের জীবনের অনুভবে তাকে নতুনভাবে রূপ দিয়েছেন। পাহাড়ি বালিকার গানের সুর তার কাছে হয়ে ওঠে জীবনের প্রতীক—অচেনা অথচ অন্তরস্পর্শী। সুরের মধ্যে বেদনা, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মিক শান্তি—সব মিলিয়ে কবিতাটি এক ভিন্নতর নান্দনিক আবেশ সৃষ্টি করে।
‘রক্ত গোলাপ’, ‘জ্বলন্ত বারুদ’ এবং ‘নরকের কীট’-এর মতো কবিতায় তাহমিনা খাতুন তার কাব্যধারাকে সামাজিক প্রতিবাদের স্তরে নিয়ে গেছেন। এখানে প্রেম, প্রকৃতি বা স্মৃতি নেই; আছে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, ন্যায় ও মানবতার স্বপ্ন।
‘পাণ্ডুর চাঁদ’ এই সময়ের প্রতিশ্রুতি—যেখানে আলো বিবর্ণ হলেও মানবমনের দীপ্তি ম্লান হয় না; যেখানে স্মৃতি কাঁদে, তবু জীবন তার চাঁদে আলো ছড়ায়। তাহমিনা খাতুন সেই আলোয় লেখেন জীবনের নাম, তার নিঃসঙ্গতার ছায়ায় গেয়ে যান এক অনন্ত কাব্য—নিজের, আমাদের, এই সময়ের।