খেলাফতে রাশেদার ইরাক অভিযান
ইরাক অভিযানের জন্য খলিফা আবু বকর (রা.) তিনটি বাহিনী পাঠান। মুসান্না ইবনে হারিস আগেই ইরাকের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়েন। রিদ্দা ও ধর্মদ্রোহ প্রতিরোধ যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পরে আরো দুজন সেনাপতিকে খলিফা ইরাক যাওয়ার নির্দেশ দেন। তারা হলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও ইয়াজ ইবনে গানাম। খলিফার পাঠানো তিনজন সেনানায়ক ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করলেও ইরাক ফ্রন্টের প্রধান সেনাপতি ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)।
হিরা শহরকেন্দ্রিক খলিফার পরিকল্পনা
ইরাকের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর প্রতি খলিফার স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল—আপার ইরাক দিয়ে তাকে অভিযান শুরু করতে হবে। তবে প্রধান লক্ষ্য থাকবে হিরা। হিরা অধিকার সম্পন্ন হলে এই স্থানকে কেন্দ্র করে তারা আক্রমণের পরিকল্পনা সাজাবে।
সে সময় রাজধানীর পরে ইরাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল হিরা। কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় এই শহর ছিল অতুলনীয়। কুফা নাজাফ মাদায়েনের মতো ইরাকের প্রধান শহরগুলোর সঙ্গে হিরার অবিচ্ছিন্ন সংযোগ ছিল। আর এই অঞ্চলের যেকোনো শহরে যাতায়াতের পথ হিরার মধ্য দিয়েই অতিক্রম করেছিল। আর অন্য যেকোনো শহরের চেয়ে হিরা ছিল পারস্য সম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েনের নিকটতম। তাই এই শহরের অধিকার যাদের হাতে থাকত, ইরাকত ফ্রন্টের ওয়ার স্ট্র্যাটেজিতে তারা অনেকখানি এগিয়ে যেত।
তাই ইরাকে সৈন্য পাঠানোর সময় প্রাথমিকভাবে খলিফার প্রধান লক্ষ্য ছিল হিরার দখল নিশ্চিত করা।
ইরাক ফ্রন্টে খালিদ
হিজরি ১২ সনের রজব, মতান্তরে মুহাররম মাসে খালিদকে ইরাকে পাঠানো হয়েছিল। তার সঙ্গে তখন রিদ্দা যুদ্ধে অংশ নেওয়া দুই হাজার সৈন্য ছিল। আর রবিআ গোত্র এবং মুসান্না ইবনে হারিস ও অপরাপর নেতাদের সৈন্য মিলিয়ে তার বাহিনীর আকার দাঁড়িয়েছিল ১৮ হাজার। তারা উবুল্লা শহরের কাছে সমবেত হলেন। হুরমুজের নেতৃত্বে পারসিক বাহিনী তখন উবুল্লাহর সীমান্তে অবস্থান করছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে সেনাপতি খালিদ হুরমুজের কাছে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে বললেন, ‘নিরাপদে থাকতে চাইলে ইসলাম গ্রহণ করো, অথবা জিজিয়া কর দিতে সম্মত হও। অন্যথায় আশু পরিণতির জন্য নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে দায়ী করতে পারবে না। কারণ তোমরা জীবনকে যত বেশি পছন্দ কর, আমার সঙ্গে থাকা সৈন্যরা মৃত্যুকে ততটাই ভালোবাসে।’ (তারিকে তাবারি, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ১৬৪)
শত্রু বাহিনীর কাছাকাছি গিয়ে খালিদ (রা.) সেনাবাহিনীকে তিনটি ইউনিটে ভাগ করলেন। এক ইউনিটের নেতৃত্বে ছিলেন মুসান্না ইবনে হারিস। দ্বিতীয় ইউনিটের দায়িত্বে ছিলেন আদি ইবনে হাতেম। আর শেষ ইউনিটটি খালিদ (রা.)-এর সঙ্গে ছিল। সবাইকে তিনি ভিন্ন ভিন্ন পথে ‘হাদির কূপে’র কাছে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দিলেন।
জাতুস সালাসিল যুদ্ধ (Battle of Chains)
পারস্যবাহিনীর সেনাপতি হুরমুজ কোনোভাবে খালিদ (রা.)-এর পরিকল্পনার সংবাদ পেয়ে যায়। সে মুসলিমদের আগে হাদির কূপের কাছে পৌঁছানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পারস্য বাহিনীর প্রধান দুই কমান্ডার কুব্বাজ ও আনুশুজানের নেতৃত্বে সে হাদিরের উদ্দেশে অগ্রবর্তী রওনা করিয়ে দেন। পারস্য বাহিনীকে হাদিরে যেতে দেখে খালিদ (রা.) পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন এবং বাহিনী নিয়ে কাজিমার উদ্দেশে যাত্রা করেন। তিনি কাজিমায় গিয়ে দেখেন, পারস্য বাহিনী তাদের আগেই সেখানে পৌঁছে গেছে এবং সুপেয় পানির উৎসগুলো দখল করে নিয়েছে। খালিদ (রা.) ভালো জায়গা দেখে শিবির স্থাপন করেন এবং পানির উৎস নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নেন। তখন আকাশ থেকে আল্লাহর রহমত হয়ে বৃষ্টি নামে। ফলে মুসলিম বাহিনীর পানির প্রয়োজন পূরণ হয়।
হুরমুজ ছিল স্বভাবগতভাবে খুবই নিকৃষ্ট প্রকৃতির এক লোক। নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই তার মধ্যে ছিল না। এমন কোনো জঘন্য কাজ নেই যা সে করতে পারত না। সে দ্বৈত যুদ্ধের নাম করে সেনাপতি খালিদকে সামনে ডেকে এনে হত্যা করার দুরভিসন্ধি করে।
দুই বাহিনী মুখোমুখি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। খালিদ (রা.) সামনে এগিয়ে এসে হুরমুজকে দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানায়। হুরমুজও এগিয়ে আসে। দুই বাহিনীর দুই সেনাপতি মুখোমুখি হন। আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ চলতে থাকে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একসময় হুরমুজের দেহরক্ষীরা এগিয়ে এসে খালিদ (রা.)-কে ঘিরে ফেলে। সেনাপতি খালিদ ঘাবড়ে না গিয়ে তরবারির আঘাতে হুরমুজকে হত্যা করে ফেলেন।
এই সময় কাকা ইবনে আমর সেনাপতিকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। দুই বাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াই শুরু হয়। সেনাপতি হুরমুজের মৃত্যুতে পারস্য বাহিনীর মনোবল এমনিতেই ভেঙে পড়েছিল। তাই মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের সামনে তারা টিকতে পারে না। এমনকি তারা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও পায় না। কারণ সৈন্যদের পলায়নপরতা রোধে হুরমুজ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। শেকল দিয়ে সৈন্যদের একজনের পা অন্যজনের সঙ্গে বেঁধে দিয়েছিল। ফলে পালিয়ে জান বাঁচানোর সুযোগও তাদের অনেকের হলো না। যুদ্ধ শেষে মুসলিমরা বিপুল পরিমাণে গনিমত অর্জন করল।
বিজিত অঞ্চলের সাধারণ নাগরিক ও খালিদ ইবনে ওয়ালিদ
ব্যাটল অব চেইনে জয় অর্জন করার পরে খালিদ (রা.) বিশেষ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা সাধারণ নাগরিক ও কৃষকদের কোনো ক্ষতি তিনি করেননি। তাদের জমিন বা ফসলে তিনি হাত দেননি। তাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাদের জাকাতের বিধান জানিয়ে দিলেন। যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদের জন্য জিজিয়া ধার্য করলেন। এতদিন জমিদাররা তাদের কাছ থেকে যে পরিমাণ খাজনা আদায় করত, তার তুলনায় খালিদের ধার্যকৃত জিজিয়া করের পরিমাণ ছিল খুবই কম। ফলে প্রজাসাধারণ আনন্দপূর্ণ চিত্তে মুসলিমদের শাসন মেনে নিল।
মাজার যুদ্ধ
ব্যাটল অব চেইনের আগে মুসলিম বাহিনীর সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে হুরমুজ পারস্য সম্রাটের কাছে পত্র পাঠিয়েছিল। পত্রপাঠে সম্রাট হুরমুজের কাছে কারানের নেতৃত্বে সাহায্যকারী বাহিনী পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু নিজের সৈন্যদের নিয়ে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টির কারণে হুরমুজ সাহায্যকারী বাহিনীর জন্য অপেক্ষা না করে মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হলো এবং সে নিজে নিহত হলো আর তার বাহিনী ভীষণভাবে পরাজিত হলো। তারা যুদ্ধের ময়দানে টিকতে না পেরে এদিক-সেদিক পালিয়ে যেতে থাকল। তাদের পেছনে ধাওয়া করছিলেন দুই মুসলিম ভাই—মুসান্না ও মুআন্না।
পথিমধ্যে কারানের বাহিনীর সঙ্গে পলায়নতর বাহিনীর সাক্ষাৎ হলো। কারান তাদের বিভিন্ন কথা বলে এবং উৎসাহ দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ফিরিয়ে নিয়ে আসল। কারানের সৈন্য সমাবেশের সংবাদ পেয়ে খালিদ (রা.)-ও এগিয়ে এলেন। মাজার নামক স্থানে দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো।
মাজারের যুদ্ধেও মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করল। পারস্য বাহিনীর সেনাপতি কারান নিহত হলো। তার সঙ্গে কাব্বাজ, আনুশুজানসহ আরো অনেক শীর্ষ নেতা মারা গেল। এই যুদ্ধে কারানের বাহিনীর ৩০ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছিল।
যুদ্ধ শেষে খালিদ (রা.) মাজারে শিবির স্থাপন করলেন।
ওয়ালাজার যুদ্ধে খালিদের কৌশল
মাজার যুদ্ধে কারানের পরাজয়ের সংবাদ পারস্য সম্রাট কিসরার কানে গেল। তিনি মুসলিমদের প্রতিহত করার জন্য দৃঢ় সংকল্প নিলেন। রাজধানী মাদায়েন থেকে তিনি আনদারজাগারের নেতৃত্বে বিশাল এক বাহিনী পাঠালেন। আনদারজাগার মাদায়েন থেকে কিরকিস হয়ে ওয়ালাজায় পৌঁছাল। অন্যদিকে রিজার্ভ হিসেবে কিসরা বাহমান ইবনে জাজুয়াইহকে পাঠিয়েছিলেন। আনদারজাগারের পরিকল্পনা ছিল—দুদিক থেকে অগ্রসর হয়ে তারা মুসলিম বাহিনীকে চেপে ধরবে। তাই বাহমানকে তিনি সাওয়াদের দিক থেকে এগিয়ে আসতে বললেন। আনদারজাগার স্থানীয় লোকদের সঙ্গে নিয়ে বিপুল এক বাহিনী গড়ে তুলল। যখন তার মনে বিশ্বাস জন্মাল, এই পরিমাণ সৈন্যকে পরাজিত করার ক্ষমতা মুসলিমদের নেই, তখন সে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হলো।
ওয়ারাজা ছিল দুটি দীর্ঘ টিলার মধ্যবর্তী বিস্তৃত সমতলভূমি। এই অঞ্চলের এমন ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় খালিদ (রা.) স্থানটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং সাবলীল মুভমেন্ট ও পাশ ঘুরে আক্রমণের উপযোগী মনে করলেন। সে অনুযায়ী তিনি শত্রুর বৃহৎ সমাবেশকে বিচ্ছিন্ন ও বিশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে তিনটি দিক থেকে সমন্বিত আক্রমণের পরিকল্পনা করলেন। একই সঙ্গে বাহিনীর পশ্চাদ্ভাগ এবং রসদ সরবরাহপথ নিরাপদ রাখার জন্য সুয়াইদ ইবনে মুকাররিনকে হুফাইর অঞ্চলে অবস্থান করার নির্দেশ দিলেন।
সেনাবাহিনীর দুই বাহুর দায়িত্ব দেওয়া হয় আসিম ইবনে আমর ও আদি ইবনে হাতেমকে। আর বুসর ইবনে আবি রুহম ও সাঈদ ইবনে মুররাহ আজলির নেতৃত্বে প্রায় দুই হাজার করে সৈন্যের দুটি বাহিনী পাঠানো হলো। তাদের কাজ ছিল শত্রুবাহিনীর পেছনে গোপনে প্রবেশ করে সুযোগমতো আক্রমণ করা।
খালিদ (রা.) মুসলিম সৈনিকদের নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী আনদারজাগারের বাহিনীর মুখোমুখি হলেন। সমান তালে যুদ্ধ চলতে লাগল। সেনাপতি যে দুই বাহিনীকে পেছনে সরে কিছুটা আড়ালে অবস্থান করতে বলেছিলেন, তারা আক্রমণে যোগ দিল। তখন আনদারজাগারের বাহিনী ভড়কে গেল এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলল। ফলে তারা সহজেই মুসলিম বাহিনীর হাতে পরাজিত হলো।
এই যুদ্ধ শেষে তিনি সাধারণ জনতা ও কৃষকদের নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং অমুসলিম থেকে যাওয়া প্রজাদের ওপর থেকে অন্যান্য খাজনার বোঝা সরিয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে জিজিয়া কর ধার্য করলেন।