আত্মজীবনী
‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ শিরোনামে শহীদ ওসমান হাদি তার ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন আত্মজীবনী সিরিজ। দুটি পর্ব আপলোড করা হয়েছিল। ভিডিও থেকে পর্ব দুটির অনুলিখন করেছেন মাহদি হাসান।
নেসারাবাদের পড়ালেখা
সাংস্কৃতিক এই জার্নির পাশাপাশি নেসারাবাদে পড়াশোনাটাও খুব ভালো ছিল। আমি বরাবরই ভালো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলাম—কখনো ফার্স্ট, সেকেন্ড, ফোর্থ বা ফিফথ। তবে আমার মধ্যে সবসময় ‘ফার্স্ট হতেই হবে’ এমন তাড়না ছিল না, এমনকি আমার আব্বারও এমন কোনো চাপ ছিল না; যদিও আমার অন্য ভাইবোনেরা সবসময়ই ফার্স্ট হতেন। আমিও কখনো ফার্স্ট হয়ে যেতাম, কখনো সেকেন্ড হতাম—ঘুরেফিরে প্রথম পাঁচজনের মধ্যেই সবসময় থাকতাম।
একবার এমন হয়েছিল যে, দাখিল টেস্ট পরীক্ষায় আমি ফার্স্ট হলাম। আমার যে বন্ধুটি সাধারণত ফার্স্ট হতো, সে সেকেন্ড হয়ে গেল। এতে তার আব্বা তার ওপর এত রাগ করলেন যে, সে আক্ষরিক অর্থেই (literally) আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিল!
আমার আব্বার পড়াশোনা নিয়ে যে ফিলোসফি, তা নিয়ে আমার মায়ের সারা জীবন একটি অভিযোগ ছিল—আব্বা কখনোই তার কোনো ছেলেমেয়েকে পড়তে বলতেন না। তার দর্শন ছিল, পড়তে আবার বলতে হবে কেন? নিজে থেকেই পড়বে। বরং আব্বা সারা জীবন বলতেন, ‘কম কম পড়বা।’ আব্বার আজীবন নিয়ম ছিল—আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত পড়া যাবে না, বাইরে হাঁটতে হবে বা খেলতে হবে। আবার রাত ১০টার পর জেগে পড়াশোনা করা যাবে না। আব্বা যখন নলসিটি থেকে নেসারাবাদে আমাদের দেখতে যেতেন, আমার বন্ধুরা খুব মজা পেত। কারণ সবার গার্ডিয়ানরা এসে বলতেন, ‘ভালো করে পড়াশোনা করো, বেশি বেশি পড়ো’; আর আব্বা বলতেন, ‘কম কম পড়বে, আসরের পর আর রাত ১০টার পর পড়বে না।’
আমার ল্যাঙ্গুয়েজের প্রতি, অর্থাৎ আরবি ও ইংলিশের প্রতি ছোটবেলা থেকেই এক ধরনের ন্যাচারাল ইনক্লিনেশন (natural inclination) ছিল। যেকোনো ল্যাঙ্গুয়েজ শেখার প্রতি আমার ভীষণ আগ্রহ ছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমি আরবি ও ইংলিশে ভালো করতাম। ইন্টারমিডিয়েট টেস্ট পরীক্ষার সময়কার একটা গল্প মনে পড়ছে—আমি তখন একদমই পড়াশোনা করছিলাম না, বরং ইংলিশ নিয়ে প্রচুর সময় দিচ্ছিলাম। কারণ এসএসসির পর আমি ঢাকায় এসে ইংলিশ কোচিং করেছিলাম এবং সেখানে ভালো করার কারণে ইংলিশে এত বেশি ইনভলভড হয়ে গিয়েছিলাম যে, অন্য কিছু পড়তামই না।
ফলাফল হিসেবে দেখা গেল, টেস্ট পরীক্ষায় আমি ১০ না ১২ পেলাম! এক ঘণ্টা বসে কিছু একটা লিখে চলে এসেছিলাম, বাকি পরীক্ষা আর দিইনি। এটা পুরো মাদরাসার জন্য একটা বিরাট গসিপ হয়ে গেল যে—ওসমান কীভাবে ১০ পায়? এখন আমাকে নিয়ে টিচাররা কী করবেন? পরে অবশ্য টেস্টে ফর্ম ফিলাপ করলাম। আমার একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, দরজা বন্ধ করে দুই মাস পড়লে ইনশাআল্লাহ ভালো করব। আর হয়েছিলও তা-ই। আমার মনে আছে, ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার থেকেই আমি আমাদের হিস্ট্রি (ইতিহাস) এবং সিভিক্স (পৌরনীতি) পরীক্ষায় প্রশ্নগুলোর উত্তর বাংলায় না লিখে ইংলিশে লিখতাম। আমার শিক্ষকরা এটা দেখে খুবই খুশি হতেন।
এই গল্পগুলো এমনিতে বলা যে—আমাদের ওখানে গ্রুমিংটা আসলে কেমন ছিল। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পরে আমি ঢাকায় আসি এবং সাইফুরসে ইংলিশ স্পোকেন, ফনেটিক্স ও প্রেজেন্টেশনের ওপর কোচিং করি। তখন সাইফুরস খুব নামকরা ছিল। সারা ঢাকার সব ব্রাঞ্চ মিলে ওদের একটি ডিবেট কম্পিটিশন হলো। ধাপে ধাপে এগোতে এগোতে সর্বশেষ মৌচাক বনাম পান্থপথ ব্রাঞ্চের ফাইনাল হলো। আমি ছিলাম মৌচাক ব্রাঞ্চের টিমে। আমার টিমে আরো তিনজন ছিল—ভিকারুননিসা ও আইডিয়াল স্কুলের। আর আমি ছিলাম একমাত্র ‘হুজুর’। পান্থপথ ব্রাঞ্চের সঙ্গে সেই ডিবেটে আমাদের টিম উইন করল এবং আমি ‘বেস্ট স্পিকার’ হলাম। এটা আমার জীবনের খুবই দারুণ একটা গল্প; কারণ তখন আমি জামা, পায়জামা ও টুপি পরি।
এসএসসির পর
সবাই ভেবেছিল এসএসসির পরে আমি হয়তো ঢাকার কোনো কলেজে ভর্তি হয়ে যাব, ঝালকাঠিতে আর ব্যাক করব না। আমাদের যিনি ফনেটিক্সের ক্লাস নিতেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশের শিক্ষক ছিলেন—আলিফ স্যার। তিনি যখন জিজ্ঞেস করলেন, আমি বললাম, ‘না, আমি আবার গিয়ে মাদরাসায় ভর্তি হব।’ তিনি শুনে কিছুটা আপসেট হলেন; সবাই প্রত্যাশা করছিলেন, আমি যেহেতু পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই, তাই আমার কোনো ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া উচিত। কিন্তু আমার মনে আছে, আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘আমার যেসব বন্ধু ভিকারুননিসা, নটর ডেম বা হলিক্রসে ভর্তি হবে, তারা সবাই ভালো ইংলিশ জানে, বাংলা জানে; কিন্তু আরবি তো জানে না। আমার ভালো লাগার ব্যাপার হলো—আমি তাদের মতো করে ইংলিশ আর বাংলা যেমন জানি, তেমনি আমি যে আরবিটা শিখছি, সেটা আমার মধ্যে বাড়তি একটা এফিসিয়েন্সি (efficiency)। আমি সেটাকেই আরো গ্রো করতে চাই।’ এটা শুনে স্যার খুব খুশি হয়েছিলেন।
এরপর আমি আবার ব্যাক করলাম এবং নেসারাবাদে আলিমে ভর্তি হলাম। আলিমে আমি একদমই একাডেমিক পড়াশোনা করিনি বললেই চলে; আমি প্রচুর সময় দিতাম ইংলিশ আর ফনেটিক্স নিয়ে। সময় পেলেই ঢাকায় চলে আসতাম এবং সেই টিচারদের সঙ্গে ক্লাস করতাম। লাকিলি, আমি যখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, তখন ঢাকা থেকে ‘স্যাঙ্গুইন ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ঝালকাঠিতে গেল স্পোকেন ও ফনেটিক্স শেখানোর জন্য। তারা টিচার নেবে শুনে আমি কৌতূহলবশত অ্যাপ্লাই করলাম। যেহেতু তখন ভালো ইংলিশ বলতাম, তারা আমাকে টিচার হিসেবে নিয়োগ দিল। আমি তখন মাত্র ইন্টারে পড়ি, অথচ আমার কাছে যারা স্পোকেন ও ফনেটিক্স শিখতে ভর্তি হলো, তারা সবাই আমার চেয়ে বড়—কেউ বরিশাল বিএম কলেজে অনার্স পড়ে, কেউবা মাস্টার্স। আমি ইন্টারে পড়েও তখন বড়দের ট্রেইন আপ করাচ্ছিলাম।
এটা আমার জীবনে একটা বিরাট গল্প। স্যাঙ্গুইন ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব আমার জীবনের এক বিশাল অংশজুড়ে আছে; ঝালকাঠিতে যারা আছেন তারা নিশ্চয়ই এটি মনে করতে পারবেন। স্যাঙ্গুইনের সঙ্গে আমার এই সম্পর্ক সেই ইন্টারমিডিয়েট থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পর্যন্ত অটুট ছিল। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যতদিন পড়েছি, ততদিন পর্যন্ত বছরে অন্তত একবার গিয়ে সেখানে সাত দিন থাকতাম এবং সেখানকার টিচারদের ট্রেনিং করাতাম। এই সম্পর্কটা আমি সযত্নে ধরে রেখেছিলাম, কারণ ওখান থেকেই আমার প্রফেশনাল জার্নি শুরু হয়েছিল।
আরেকটা মজার ব্যাপার হলো—আমার প্রফেশনাল লাইফের প্রথম স্টুডেন্ট ছিল আমারই বন্ধুরা। আমরা যখন ইন্টারে পড়ি, তখন রোজার মাসে আমাদের এক মাস ছুটি দিল। আমি যেহেতু আলহামদুলিল্লাহ ইংলিশে ভালো ছিলাম, আমার প্রায় ৫০ জন বন্ধু আমাকে ধরে বসল যে, ‘আমরা যেহেতু বাড়ি যাব না, তুইও থাক; আমাদের স্পোকেন ইংলিশটা পড়া।’ আমরা সেটা শুরুও করলাম। মাদরাসার অনুমতি নিয়ে আমাকে একটি ক্লাসরুম দেওয়া হলো। আমার বন্ধুরা ক্লাস করে, আমি তাদের পড়াই; সারা দিন-রাত একসঙ্গে দুষ্টুমি করি আর দিনে তাদের ক্লাস নিই।
তবে দু-একজন টিচার বিষয়টিকে একটু বাঁকাভাবে নিলেন। কিন্তু জীবনে কোনো কিছু খুব মনে-প্রাণে চাইলে আল্লাহ পথ সহজ করে দেন—এর প্রথম প্রমাণ আমার লাইফে তখনই ঘটল। কয়েকজন শিক্ষক ভালোভাবে না নিলেও বাকিরা সবাই ভীষণ সাপোর্ট করলেন। আমি বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম; আমি এখান থেকে একটা আউটপুট দেখাতে চেয়েছিলাম। প্রথমে দিনে ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত ক্লাস করাতাম। পরে সময় বাড়িয়ে বিকালেও ক্লাস নেওয়া শুরু করলাম। এমনকি ইফতারের পর তারাবির শেষে রাত ১১টা থেকে শুরু করে প্রায় ১টা-২টা পর্যন্ত ক্লাস করাতাম।
আমি তখন শারীরিকভাবে ভীষণ অসুস্থ ছিলাম; কিন্তু আপনি যখন মনে-প্রাণে কিছু করতে চাইবেন, আল্লাহ আপনাকে সেই শক্তি দিয়ে দেবেন। আমার মনে আছে, পুরো রোজার মাস আমি ভীষণ অসুস্থতা নিয়ে সকালে, বিকালে ও রাতে ক্লাস করিয়েছি। আমি একা ছিলাম ট্রেইনার হিসেবে, আর আমার বন্ধুরা ছিল লার্নার। আমি চাচ্ছিলাম কোর্স শেষে একটা প্রোগ্রামের আয়োজন করতে, যেখানে আমার বন্ধুরা পারফর্ম করবে।
আলহামদুলিল্লাহ, ২৫ রমজানে আমাদের সমাপনী অনুষ্ঠান হলো। আমরা আট-দশজন টিচারকে দাওয়াত দিলাম। আমাদের বন্ধুরা যারা ক্লাস করেছিল, তারা সেখানে চমৎকারভাবে ইংলিশে প্রেজেন্টেশন দিল। আমাদের শিক্ষকরা এটা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আমার যে আট-দশজন বন্ধুকে আমি গ্রুমিং করার সুযোগ পেয়েছিলাম, তাদের প্রায় সবাই পরে আমার সঙ্গে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। আমার এই বন্ধুরা স্বাভাবিকভাবে আমাকে ‘তুমি’ করে ডাকার কথা, কিন্তু তারা আমাকে এখনো ‘আপনি’ করে ডাকে। অনেকেই জিজ্ঞেস করে, এটা কেমন কথা? এর কারণ হলো—সেই যে লম্বা সময় আমি তাদের ক্লাস নিয়েছি, তারা আমাকে ‘আপনি’ ডেকেই এক ধরনের আনন্দ পায়। আমরা বন্ধুরা আসলে এমনই।
তো এই গল্পটা এজন্য বললাম, আমার সেই সাংস্কৃতিক যাত্রা, ছাত্র সংসদ নির্বাচন, বিএনপির মিছিলে অংশ নেওয়া—সবকিছুই ছিল একটা লম্বা জার্নি। এর সঙ্গে বন্ধুদের পড়ানো এবং ঝালকাঠি স্যাঙ্গুইন ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাবে টিচার হিসেবে আলহামদুলিল্লাহ বেশ নাম করে ফেলা—এই সবকিছুই আমাকে আজকের ‘আমি’ হতে সাহায্য করেছে।