আরব ঐতিহাসিকদের বিবরণ
দশম শতাব্দীতে সমুদ্রবাণিজ্যের রুটগুলোয় ছিল আরবদের একচেটিয়া আধিপত্য। বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ উপকূল এবং শ্রীলঙ্কাজুড়ে আরব বণিকদের বড় বড় বসতি গড়ে উঠেছিল; একই ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা দক্ষিণ চীন সাগর ও ফিলিপাইনের দ্বীপমালাতেও বিস্তৃত হয়। বাস্তবিকভাবেই এই বাণিজ্যপথে আরব বণিকদের নিয়ন্ত্রণ এতটাই ব্যাপক ও প্রভাবশালী ছিল যে, ইউরোপীয়রা নিজেদের জন্য লাভজনক পথ বের করতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিল। কেএ নিজামী এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘উপমহাদেশের সঙ্গে আরব বিশ্বের সম্পর্ক সুদূর অতীতে প্রোথিত। ইসলামের উত্থানের অনেক আগে থেকেই ভারত ও আরবের মধ্যে প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিদ্যমান ছিল এবং আরব বণিকরা মিসর ও সিরিয়ার মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি করত।’ এলফিনস্টোন যথার্থই মন্তব্য করেছেন, জোসেফের যুগ থেকে শুরু করে মার্কো পোলো ও ভাস্কো দা গামার সময় পর্যন্ত ভারতের বাণিজ্যের প্রধান নিয়ন্তা ছিল আরবরাই। ভারতের পশ্চিম উপকূলে বিপুলসংখ্যক আরব উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল, আর আরব দেশগুলোয়ও বহু ভারতীয় বসতি প্রতিষ্ঠিত ছিল।
ইসলামের বিস্তার এবং আরবদের ইসলাম গ্রহণের পরও এই উপনিবেশগুলো আগের মতোই বিকশিত হতে থাকে। ভারতের রাজারা নিজেদের রাজ্যে মুসলিম বিচারক নিয়োগ করতেন, যারা hunurman নামে পরিচিত ছিল। তারা মুসলমানদের বিচারকাজ পরিচালনা করতেন এবং তাদের সামষ্টিক জীবন সংগঠনের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হতো। বাণিজ্যিক যোগাযোগ সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও জন্ম দেয়; ফলে বহু আরবি নৌ-পরিভাষা ও অন্যান্য শব্দ ভারতীয়রা গ্রহণ করে, আর ভারতের রীতিনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও আচরণপদ্ধতি আরবেও প্রবেশ করে। ভাষাতাত্ত্বিকরা কোরআনে ব্যবহৃত তিনটি সংস্কৃতমূল শব্দের সন্ধান পেয়েছেন। সেগুলো হলো—মেশক (Musk), জানবিল (ginger) এবং কাফুর (camphor)। (Nizami, K. A., প্রাগুক্ত।)
এভাবে বাংলাসহ ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। সুদূর প্রাচ্যের চীনে বাণিজ্যযাত্রার পথে এই উপমহাদেশের বন্দরগুলো মধ্যবর্তী স্থানে পড়ত। তাই আরব বণিকরা সেখানে বিশ্রামের জন্য থামত এবং সেখানে অবস্থান করত। ধীরে ধীরে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাংলা, বার্মা, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে সুদূর চীন পর্যন্ত সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে। ফলে ভারত ও বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলগুলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে বাণিজ্যের এক সংযোগ ভূমিতে পরিণত হয়। (See Hourani, George Faldo, Arab Seafaring in the Indian Ocean in Ancient and Medieval Times, (Princeton University Press, 1951)। ইতিহাসে এটা স্বীকৃত যে, সিলন থেকে আগত আরবের জাহাজ বহর সিন্ধুর দেবল উপকূলে জলদস্যুদের হাতে আক্রান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৭১২ সনে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু অভিযান পরিচালনা করেন। এর ফলে শুধু আরবদের নৌযোগাযোগ নিরাপদ হয়নি, বরং সমুদ্রপথে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নতুন গতি ও প্রেরণা লাভ করে।
দুর্ভাগ্যবশত, বাংলার সঙ্গে আরবদের প্রাথমিক যোগাযোগ সম্পর্কে আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে আরব ভূগোলবিদদের রচনায় পরোক্ষ কিছু বিবরণ পাওয়া যায় এবং এর মাধ্যমে সাধারণভাবে পূর্ব ভারত এবং বিশেষভাবে বাংলার কয়েকটি স্থান শনাক্ত করা যায়। এ প্রসঙ্গে সুলাইমান তার ‘সিলসিলাতুত তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে লিখেছেন—
‘এই তিনটি রাষ্ট্রের সীমানা রুহমি নামে পরিচিত এক রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। এই রাজ্যটি গুর্জর-প্রতিহার রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। এই রাজার মর্যাদা খুব উচ্চ বলে বিবেচিত নয়। তিনি যেমন বালহারার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তেমনি গুর্জর রাজার সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িত। তার সৈন্যসংখ্যা বালহারা, গুর্জর বা তফকের রাজার তুলনায় অধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়, তিনি যখন যুদ্ধে অভিযানে বের হন, তখন তার সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার হাতি থাকে।
তার সৈন্যবাহিনীতে ১০ থেকে ১৫ হাজার লোক রয়েছে, যাদের দায়িত্ব কাপড় ধোয়া এবং তা প্রক্রিয়াজাত করা। তার দেশে এমন এক বিশেষ প্রকারের বস্ত্র প্রস্তুত হয়, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। বস্ত্রটি এত সূক্ষ্ম ও কোমল যে, সেই বস্ত্রের তৈরি পোশাক একটি আংটির ছিদ্র দিয়েও অনায়াসে পার করা যায়। এটি তুলা থেকে প্রস্তুত এবং আমরা এর একটি নমুনা দেখেছি। সেখানে কড়ি শাঁসের মাধ্যমে বাণিজ্য ও লেনদেন পরিচালিত হয়; এটা সেই দেশের প্রচলিত মুদ্রা। তাদের দেশে স্বর্ণ ও রৌপ্যও বিদ্যমান।’ (Elliot and Dowson, History of India as told by its own Historians, vol. 1, (London, 1867), p.-5.)
আধুনিক গবেষকরা সুলাইমানের বর্ণনায় উল্লিখিত ‘রুহমি’ রাজ্যকে শনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন। হোদিওয়ালার মতে, রুহমি রাজ্যকে বাংলার ধর্মপাল (৭৭০-৮১০) শাসিত রাজ্য হিসেবে শনাক্ত করা যেতে পারে। (Hodivala, S. H., Studies in Indo-Muslim History, (Bombay, 1939), p.-4.)। সুলাইমানের বিবরণে হাতির উপস্থিতি, সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্রের উৎপাদন এবং কাড়ির মাধ্যমে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের যে উল্লেখ পাওয়া যায়, তা স্পষ্টতই বাংলার দিকেই ইঙ্গিত করে। কারণ পরবর্তী সকল লেখক, যেমন মিনহাজ, ইবন বতুতা এবং প্রায় সব ইউরোপীয় পর্যটক বাংলা সম্পর্কে একই রকমের তথ্য প্রদান করেছেন।
মাসউদি লিখেছেন, ‘রাহমা রাজ্য সমুদ্রতট ও স্থলভাগ—উভয় দিকেই বিস্তৃত। এর সীমান্তে অবস্থিত একটি অভ্যন্তরীণ রাজ্য হলো কামান রাজ্য।’ (Elliot and Dowson, op. cit., p.-25)। ‘কামান’ শব্দটি কামরূপেরই এক ভিন্ন রূপ; সুতরাং রাহমা রাজ্যকে বাংলা হিসেবে শনাক্ত করা যায়।
ইবন খুরদাদবিহ উল্লেখ করেছেন, সারানদীপের পরে জাজিরাতুর রামি অবস্থিত, যেখানে বিচিত্র একশৃঙ্গ প্রাণী এবং ক্ষুদ্রাকৃতির নগ্ন মানুষ বাস করে। (Khurdadbih, Ibn, Kitab al-Masalik wal-Mamalik, (EJ. Brill, 1889), p.-65)। ইয়াকুত হামাওয়ি একে মালাক্কা প্রণালির কাছে ভারতের সর্বশেষ ভূখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। (Yaqut, Mu'jam al-Buldan, (Beirut edition, 1957), vol.-3, p.-18.) এই সমস্ত বিবরণ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রামি, রাহমা বা রুহমা অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগর ও মালাক্কা প্রণালির মধ্যবর্তী উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত ছিল।
আমরা জানি, রামু বা রামে নামে একটি রাজ্য বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূলে বিদ্যমান ছিল, চট্টগ্রামের কয়েকটি জেলা যার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে রামু বাংলাদেশে কক্সবাজার জেলার একটি ছোট শহর। ১৫৮৫-৮৬ সালে বাংলায় সফরকারী ইংরেজ পর্যটক রালফ ফিচও ‘রামে’ রাজ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। (Purchas, S., Hakluytus Posthumas or Purchas His pilgrims, vol.-10, (Glasgow, 1906), р.-183)। অতএব ধারণা করা যায়, আরব ভূগোলবিদদের বর্ণিত জাজিরাতুর রামি মূলত চট্টগ্রাম উপকূলবর্তী রামি রাজ্য—বর্তমান রামুকেই নির্দেশ করে।
উবাইদুল্লাহ ইবন খুরদাদবিহ ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহের আলোচনার সময় ‘সারানদীপ’ (সিলোন) এবং ‘কুদাফারিদ’ নদীর (পূর্ব ভারতের গোদাবরী) পর একটি বন্দরনগরীর কথা উল্লেখ করেছেন, যার নাম ‘সামান্দার’। তিনি জানান, সেখানে ধান উৎপন্ন হতো এবং কামরুন নামে পরিচিত এক ভূখণ্ড থেকে ১৫ বা ২০ দিনের পথ অতিক্রম করে মিঠা পানির নদীপথে রপ্তানির উদ্দেশ্যে আগর কাঠ সেখানে আনা হতো। (Khurdadbih, Ibn, op. cit., pp.-63-64.)
আল-ইদ্রিসিও ‘সামান্দার’ বন্দরের বিবরণে লিখেছেন—“সামান্দার একটি বৃহৎ নগরী, বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধ ও আর্থিকভাবে প্রাচুর্যময়, সেখানে লাভজনক ব্যবসার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এই নগরী কানৌজের অধীনস্থ; কানৌজের দেশের রাজাই এর শাসক। এটি এমন একটি নদীর তীরে অবস্থিত, যার উৎস কাশ্মীর। এখানে ধান ও নানাপ্রকার শস্য পাওয়া যায়, বিশেষত উৎকৃষ্ট মানের গম। কামরুত (কামরূপ) অঞ্চল থেকে ১৫ দিনের দূরত্ব অতিক্রম করে মিষ্ট পানির নদীপথে আগর কাঠ এখানে আনা হয়। এই দেশের আগর কাঠ গুণগত মানে শ্রেষ্ঠ এবং সুবাসে অতুলনীয়; এটি কারান পর্বতমালায় জন্মে। এই নগরী থেকে এক দিনের নৌযাত্রার দূরত্বে জনবহুল এবং সর্বদেশীয় বণিকদের নিয়মিত পদচারণায় মুখর একটি বৃহৎ দ্বীপ রয়েছে। এটি সারানদীপ দ্বীপ থেকে চার দিনের দূরত্বে অবস্থিত। সামান্দার থেকে উত্তরে সাত দিনের দূরত্বে রয়েছে ভারতজুড়ে প্রসিদ্ধ এবং কানৌজের অধীনস্থ কাশ্মীর নগরী। কাশ্মীর থেকে কামরুত চার দিনের পথ, আর কাশ্মীর থেকে কানৌজ প্রায় সাত দিনের পথ। এটি একটি উৎকৃষ্ট বাণিজ্যনগরী, যার নাম থেকেই ঐ দেশের রাজার পরিচিতি গৃহীত হয়েছে।” (Al-Idrisi, Nuzhat al-Mushtaq, extract translated in Elliot, Arab geographers, pp. 90-91.)