তিনি ছিলেন খুবই সাধারণ একজন মানুষ। অখ্যাত গ্রামীণ এক বাজারে বাবুর্চির কাজ করতেন। কিছু টাকা আয়ের জন্য অবসরে বের হয়ে পড়তেন ঠেলাগাড়ি নিয়ে। তার দিন আনি দিন খাই পরিবার। আর্থিক সচ্ছলতা তার মোটেই ছিল না। পরিবার নিয়ে কোনো মতে বেঁচেবর্তে ছিলেন। কিন্তু একদিন দেখা গেল এই মানুষটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বদলে দিতে সবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
তার নাম ছয়ফুর রহমান। সিলেটের সালুটিকর গ্রামে তিনি বসবাস করতেন। একেবারে সাধারণ মানুষ বলতে যা বোঝায়, তিনি তা-ই ছিলেন। কিন্তু একটা জায়গায় তিনি ছিলেন অন্য সবার থেকে ব্যতিক্রম। তার ছিল অদম্য সাহস, হার না মানা মনোবল ও প্রতিবাদী মনোভাব। তিনি জীবন ও সমাজঘনিষ্ঠ ইস্যু নিয়ে সরব থাকতেন। তিনি সিলেট অঞ্চলে একটা সময় বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। জাতীয় মিডিয়ায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন আলোচিত ব্যক্তি।
১৯৮১ সালের নির্বাচনে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
তার প্রচার-প্রচারণার কৌশল ছিল অভিনব। বক্তা হিসেবে খুব রসিক ছিলেন। ছড়ার সুরে সুরে বক্তৃতা করতেন। মূল ইস্যু নিয়ে রসিকতা করতেন, কিন্তু দাবির কথা বলতে ভুলতেন না। তার কথা শুনতে সাধারণ মানুষের ভিড় হতো। বক্তৃতা শেষ হলে উপস্থিত জনতার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা উঠিয়ে মাইকের ভাড়া দিয়ে দিতেন।
তার নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিও ছিল অভিনব। ক্ষমতায় গেলে খালেদা-হাসিনাকে বোরকা পরানোর প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেশের কোনো রাস্তাঘাট পাকা করার দরকার নেই। রাস্তা তুলে দিয়ে সেখানে খাল করে ফেলতে হবে। তার দলের নাম ছিল ‘ইসলামি সমাজতান্ত্রিক দল’। সেই দলে কোনো সদস্য নেওয়া হতো না।
নির্বাচনে তিনি খুব খারাপ ফল করেননি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ৬০-৬৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮ নম্বর হয়েছিলেন। তারপর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি দেশের ৮ নম্বর রাষ্ট্রপতি । ইলেকশনের দিন বাকি সাতজন মরে গেলে আমি রাষ্ট্রপতি হতে পারতাম।’
১৯৯০ সালে তিনি সদর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। হেভিওয়েট প্রার্থীদের পরাজিত করে চেয়ারম্যান হওয়ায় তার নাম হয়েছিল ছক্কা ছয়ফুল। উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সফল ছিলেন। তার মূল ফোকাস ছিল প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষা ঠিক করা। হুটহাট যেকোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাইমারি স্কুলে ঢুকে পড়তেন। শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেই শোকজ করে দিতেন। ইউনিয়ন পরিষদের দুর্নীতি বন্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। এতে ক্ষিপ্ত চেয়ারম্যানরা একজোট হয়ে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব দিলে তিনি পদ হারান।
অদ্ভুত কয়েকটি ছোট সাইজের বই ছিল তার। একটির নাম ‘বাবুর্চি প্রেসিডেন্ট হতে চায়’। সেই বইটির পেছনে তার দাঁত-মুখ খিঁচানো সাদাকালো ছবি, নিচে লেখাÑ‘দুর্নীতিবাজদের দেখলেই এ রকম ভ্যাংচি দিতে হবে’। তার অন্য একটি বই ছিল ‘পড়, বুঝো, বল’।
জীবনের শেষ সময়ে এই মহান মানুষটি সিলেট ডিসি অফিসের বারান্দায় চিকিৎসা খরচের দাবিতে অনশন করেছিলেন এবং দাবি আদায়ও করেছিলেন। চিরকালীন দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেই এই মানুষটি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।